ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে স্থবির হয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্য। জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতি ঘটছে। যোগাযোগ, উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিক্ষা খাতে প্রভাব দৃশ্যমান।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। প্রায় ৯৫ ভাগ জ্বালানি আমদানি হয় এই দেশগুলো থেকে। সংঘাত শুরুর পর থেকে জ্বালানি অস্থিরতায় ভুগছে বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে অফিস ও বিপণি কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে কর্মঘণ্টার নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। সম্প্রতি জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে।
শহরের স্কুলে ব্লেন্ডেড লার্নিং বা হাইব্রিড শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতিতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করবে সরকার। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন গণমাধ্যমে জানান, বৈশ্বিক সংকটের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সপ্তাহে ছয় দিনের তিন দিন সরাসরি ও তিন দিন অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত শহরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োগ করতে চায় সরকার এবং গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হবে। ব্লেন্ডেড লার্নিং প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীদারসমূহ কতটা প্রস্তুত এবং এটি প্রকৃতপক্ষে বাস্তবায়নযোগ্য কি না, সে ব্যাপারে ধোঁয়াশা রয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা গবেষকরা। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জিত না হওয়া, শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়া ও সামাজিক-মানসিক ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান নানান শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করতে পারে ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতি।
করোনাকালীন ব্যর্থতা
করোনা মহামারির ফলে ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ শিক্ষাবর্ষ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। অপ্রস্তুত শিক্ষা কাঠামো অনেকটা বাধ্য হয়ে ডিস্ট্যান্স লার্নিং বা অনলাইন শিখন-শিক্ষণে প্রবেশ করে। প্রযুক্তি স্বল্পতা, প্রশিক্ষণ ঘাটতি, কাঠামোগত শূন্যতা, ডিজিটাল রিসোর্স বা কনটেন্ট স্বল্পতা ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পূর্ব ধারণা না থাকায় সম্পূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। সরকার শিখন শূন্যতা (Learning Gap) রেখেই অসম্পূর্ণ পাঠ্যক্রমে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে। সরাসরি শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে দূরে থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক মিথস্ক্রিয়া ঘাটতি, শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে অপূর্ণতা এবং অনলাইনসহ বিভিন্ন আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে। করোনা পরবর্তী সময়েও ডিস্ট্যান্স লার্নিংয়ের সক্ষমতা বিদ্যালয় ও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে গড়ে উঠেনি।
পরিবর্তিত শিখন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালে মাধ্যমিকে ৩৫.৯৮ শতাংশ ও প্রাথমিকে ১৩.৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থায় মাত্র ১৮.৭% স্কুলগামী শিক্ষার্থী এতে অংশ নিতে পেরেছিল। এর মধ্যে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হার (২৮.৭%) গ্রামাঞ্চলের (১৫.৯%) তুলনায় বেশি ছিল।
প্রস্তুতি ঘাটতি
করোনার প্রভাব কাটিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক ধারায় ফিরলে অনলাইন শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অংশীজনরা নতুন করে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে পরিকল্পিত উপায়ে উন্নয়ন কাজে মনোযোগ দেয়নি। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের ফলে জ্বালানি সংকটে পড়ায় সরকার ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলছে। কিন্তু অনলাইন শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় যে সব প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। পরিবর্তিত পাঠ্যক্রমে পর্যাপ্ত ডিজিটাল কনটেন্ট, পাঠ্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষক নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল উপকরণ ঘাটতি রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষণ-শিখন ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি কেমন হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি। প্রয়োজনীয় গবেষণা ও পাইলটিংয়ের জন্য যে সময় ও পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, তা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের হাতে ছিলও না। এছাড়া অনলাইনে শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কার্যকর ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) নেই।
ফলে এই মুহূর্তে সপ্তাহে তিন দিন ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার যে পরিকল্পনা, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দুর্বল শিক্ষণমান (Pedagogical Quality)
শিখন-শিক্ষণ পরিচালিত হয় দ্বিমুখী প্রক্রিয়ায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যৌথ অংশগ্রহণে কার্যকর শিখন নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনলাইন মাধ্যমে কার্যকর মিথস্ক্রিয়া গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অতি সামান্য। সরাসরি মিথস্ক্রিয়া গড়ে না উঠার ফলে শিখনে শূন্যতা (Learning Gap) অবধারিতভাবে তৈরি হবে। দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমের সাথে ক্রমশ পিছিয়ে পড়বে। দুর্বল ও ধীরগতির ইন্টারনেট শ্রেণি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন উপায়ে পরিচালনায় অন্তরায়। শ্রেণি কার্যক্রমে শিক্ষক কর্তৃক গাঠনিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর শিখন শূন্যতা (Learning Gap) শনাক্ত করে সমাধানের পর্যাপ্ত সুযোগ অনলাইন ক্লাসে থাকে না, ফলে শিখন শূন্যতা (Learning Gap) থেকেই যাবে। ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলে শিক্ষণ মান (Pedagogical Quality) অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
শিখন বৈষম্য সৃষ্টি করবে ব্লেন্ডেড লার্নিং
শহুরে সমাজে আর্থসামাজিক শ্রেণি বৈষম্য বিদ্যমান থাকায়, যে-সব শিক্ষার্থীর পারিবারিক সক্ষমতা ভালো, তাদের সাথে নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীর শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও শিখনফল অর্জনের পার্থক্য তৈরি হবে। উচ্চবিত্ত পরিবারে শিশুদের জন্য পৃথক ডিভাইসের বিপরীতে নিম্নবিত্ত পরিবারে একটি ডিভাইসের একাধিক ব্যবহারকারী (Multiple Users) থেকে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে পরিবারের সকল সদস্যের ডিভাইস ব্যবহার অসম্ভব হয়ে পড়বে। ক্ষেত্রবিশেষ আর্থিক অসচ্ছলতায় ইন্টারনেট সংযোগ সংকটও দেখা দেয়।
শহুরে সমাজে ইংরেজি মাধ্যম ও ব্যয়বহুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান ও ব্যবস্থা অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশ উন্নততর। এলিট শ্রেণির এসব শিক্ষার্থীর সাথে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের বেশ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সশরীরে শিখন (In Person Learning) কার্যক্রম পরিচালিত না হলে বৈষম্য সৃষ্টি হবে। যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের একটি অংশকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করবে।
সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমের অনুপস্থিতি
শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা ও সামাজিকীকরণের মাধ্যম সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম। সশরীরে বিদ্যালয় কার্যক্রম পরিচালিত না হলে শিক্ষার্থীর নিজেদের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া ঘটবে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত উপস্থিতি সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতর্ক ক্লাব, ক্রীড়া ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক বিকাশে জটিলতা তৈরি করবে।
ডিভাইস আসক্তি
ইতঃপূর্বে করোনাকালীন সময়ে অবারিত অবসর ও ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুদের মাঝে আসক্তি তৈরি হয়। বিভিন্ন প্রকারের গেম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসক্তির ফলে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যা দীর্ঘমেয়াদে নানামুখী সংকটের জন্ম দেয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতা, মেজাজের ভারসাম্য ও পাঠে মনোযোগ ঘাটতি লক্ষ করা যায়। ব্লেন্ডেড লার্নিং দীর্ঘ হলে এসব সংকট আবার তৈরি হবে।
বাংলাদেশের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৩০ শতাংশ শহর অঞ্চলে বাস করে। তুলনামূলক ভালো বা মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য অনেক পরিবার ও শিক্ষার্থীরা গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারের ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতি কার্যকর সমাধান হতে পারে না। নতুন করে শিখনে সংকট তৈরি হওয়া থেকে শিশুদের বাঁচাতে শিক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে। অন্য সকল খাত বিবেচনা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ সচল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণ বিকাশে সকল সুযোগ অবারিত করার স্বার্থে সশরীরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাই যুক্তিযুক্ত।
২০০৯ সালে জাতীয় শিক্ষানীতি থেকে ২০২১ সালের National Curruculum Framework (NCF) ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শিক্ষার্থীদের উপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Experiment) চালানো হয়। টেকসই পরিকল্পনা ও পাঠ্যক্রম গড়ে তুলতে না পারায় পুরো শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রজন্ম ঝুঁকির মুখে। নতুন করে আবারও পরিবর্তন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শিশুদের উপর চালানো হলে সংকট তীব্র হবে। শিক্ষা খাতে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে হলেও বিদ্যালয় স্বাভাবিক উপায়ে সচল রাখতে হবে। কালক্ষেপণ না করে সরকারের উচিত ব্লেন্ডেড পদ্ধতি থেকে স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিদ্যালয় পরিচালনা করা।
অ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post