সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়ছে মার্কিনিরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতা নীতির বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন। ‘নো-কিংস’ আন্দোলনে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন আন্দোলন ও বিভক্তি সরকারের নীতির পরিবর্তনও ঘটিয়েছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর নির্বাহী ক্ষমতার ব্যাপক ব্যবহার ও ক্রমাগত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় মার্কিনিদের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ট্রাম্পের একচ্ছত্র ক্ষমতার ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর স্বাভাবিক ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটছে বলে মনে করছেন তারা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অধিক ক্ষমতা ব্যবহার করছে এবং গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে, এমন মতামত দিয়ে আন্দোলনকারীরা ট্রাম্প প্রশাসনকে স্বৈরাচারী হিসেবেও তুলনা করছে। এরই ফলশ্রুতিতে, গতবছরের জুন মাসের ১৪ তারিখ, আমেরিকান সেনাবাহিনীর ২৫০তম বার্ষিকীতে প্রথম নো-কিংস আন্দোলনে জড়ো হয় প্রায় পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন নাগরিক। পরবর্তীতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অক্টোবরের ১৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাবেশে ঘটে। প্রায় সাত মিলিয়ন মার্কিন নাগরিক দ্বিতীয় পর্যায়ে No Kings আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতার ক্রমাগত ব্যবহার ও ইরান যুদ্ধের ফলে আন্দোলন তৃতীয় পর্যায়ে এসে পৌঁছায়। এ বছরের মার্চের ২৮ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে জুড়ে বিভিন্ন শহরে নয় মিলিয়ন মানুষের জমায়েত হয়। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার অধিক ব্যবহার ও যুদ্ধ নীতির বিপক্ষে মার্কিনিদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
এবারের নো-কিংস আন্দোলন ইরান যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠে। মার্কিনিরা মনে করছেন ইরানে আমেরিকার যুদ্ধ অনৈতিক ও ইসরায়েলের স্বার্থে মার্কিন সম্পদের অপব্যবহার। ট্রাম্পের যুদ্ধ নীতির বিপক্ষে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বনিম্ন জনসমর্থনের যুদ্ধ
ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় পাল্টা হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে। মার্কিন হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি। ফলে যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহৎ পরিসরের এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধে ৪১ শতাংশ মানুষের সমর্থন মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে কম জন সমর্থনের যুদ্ধ। ইতঃপূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৯৭ শতাংশ, ২০০১ সালে আফগানিস্তান যুদ্ধে ৯২ শতাংশ, ১৯৯১ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে ৮২ শতাংশ, ১৯৮৯ সালে পানামা যুদ্ধে ৮০ শতাংশ, ২০০৬ সালে ইরাক যুদ্ধে ৭৬ শতাংশ, ১৯৫০ সালের কোরিয়ান যুদ্ধে ৭৫ শতাংশ, ১৯৯৯ সালে কসোভা যুদ্ধে ৫৮ শতাংশ, গ্রানাডা যুদ্ধে ৫৩ শতাংশ ও লিবিয়া অভিযানে ৪৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের সমর্থন পরিলক্ষিত হয়।
লিবিয়া অভিযানের পর ইরান যুদ্ধে অধিকাংশ মার্কিনিদের সাথে সরকারের মতবিরোধ দৃশ্যমান। নাগরিকদের সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধ আরো বেগবান করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সমূহের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলন No Kings ছড়িয়ে পড়ে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি
২০২৪-এর নির্বাচনে America First নীতিতে নতুন করে যুদ্ধে না জড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। ডেমোক্রেটিক বাইডেন প্রশাসনের সময়ে শুরু হওয়া ইউক্রেন ও ফিলিস্তিন যুদ্ধ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বিঘ্ন ঘটে। বিশেষকরে ফিলিস্তিন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বিক্ষোভ অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের শুরু করা যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি সাধারণ মার্কিনিদের আকৃষ্ট করে। কিন্তু পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনিজুয়েলা আক্রমণ ও ইরান সংঘাতে পুরোদমে সম্পৃক্ত হওয়ায় ভোটাররা নিজেদেরকে প্রতারিত বোধ করছেন। এমনকি রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ ইরান আক্রমণের বিরোধিতা করছে।
অর্থনৈতিক অস্থিরতা
ইরান যুদ্ধের ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি। জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২৫ শতাংশ পরিচালিত হয় ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালী দিয়ে। সর্বশেষ ইরান এই প্রণালি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। মার্কিন বাজারে ইতোমধ্যে এই যুদ্ধের প্রভাব দৃশ্যমান। গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান মার্কিন বাজারে ২০২২ সালের পর গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মূল্য সর্বোচ্চ, এবং যুদ্ধের ব্যাপ্তি দীর্ঘ হলে এটি একটি বিপর্যয়ের কারণ হবে বলে মনে করছে তারা।
ইসরায়েলের স্বার্থে যুদ্ধ
মার্কিন নাগরিকরা মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে জড়ানো সম্পূর্ণ ইসরায়েলের স্বার্থে। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে ইসরায়েলের স্বার্থে নিজেদের সেনাবাহিনী ও সম্পদের ব্যবহার করছে। অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে বিপর্যয় বৈকি কিছুই নয় বলেও মনে করছেন তারা। এই যুদ্ধকে মার্কিনিরা অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়েছে যেখানে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমর্থন হারিয়েছে। সংঘাত ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের উপযোগিতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষও সৃষ্টি করছে। সময়ের সাথে সাথে যুদ্ধের পরিস্থিতি নতুন জনমতের জন্ম দিবে এবং মধ্যবর্তি নির্বাচনে এর প্রভাব ফেলবে এমনটাই অনুমান।
অ্যানালাইসিসি টিম
Discussion about this post