পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ইউরোপীয়রা বিশ্ব বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের যাত্রা শুরু করে। শতাব্দীর শেষলগ্নে বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিস্তারের লক্ষ্যে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো সমুদ্র অভিযানে মনোনিবেশ করে। মসলার ভূমি ভারতের খোঁজে যাত্রা করে পৌঁছে যায় আমেরিকায়। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের নৌবহর নোঙর করে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের ওয়াটলিং আইল্যান্ডে। বাণিজ্য বিস্তারে চলতে থাকে দুঃসাহসিক অভিযান। সবশেষে তারা পেয়ে যায় মসলার ভূমি ভারত ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ইন্দোনেশিয়া।
ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয়দের বাণিজ্য বিস্তারের লড়াই আফ্রিকা, এশিয়া ও সম্পূর্ণ আমেরিকায় পৌঁছে যায়। প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদে ভরপুর অঞ্চলগুলোতে নির্দয় আধিপত্য কায়েম করে তারা। গড়ে তোলে কয়েক শতাব্দীর উপনিবেশ। ফলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ও শ্রম আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের হস্তগত হওয়ার মাধ্যমে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ঘটে যায় প্রথম শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) ।
স্বল্প সময়ে অধিক উৎপাদনের সকল প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি কাঁচামাল ও শ্রমের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে পশ্চিমারা। ক্রমবর্ধনশীল শিল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হয় বিরতিহীন কাঁচামাল ও শ্রম সরবরাহ। উপনিবেশ দেশগুলোর দরিদ্র মানুষ ও তাদের সম্পদ আত্মসাৎ করার মধ্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হয়।
শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে। ধনী ও দরিদ্রের বিভাজন ক্রমে বাড়তে থাকে। উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় শ্রমিকদের দীর্ঘ সময় কলকারখানায় ব্যবহার করতে থাকে শিল্পপতিরা। শ্রমের ঘাটতি পূরণে দরিদ্র শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে কলকারখানামুখী করানো হয়। ইতালিতে শ্রমিক শ্রেণির শিশুদের বিদ্যালয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অনুত্তীর্ণ রাখা হতো, যাতে তারা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে শ্রমিকে রূপান্তরিত হয়।
প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের ধারাবাহিক বিস্তার ও পৃথিবীর সকল সম্পদ ভোগের অধিকার শুধুমাত্র পশ্চিমা পুঁজিবাদী শ্রেণির হাতে পৌঁছে যায়। সমস্ত পৃথিবীর শ্রম ও সম্পদের পশ্চিমা ব্যবহার ও ভোগ তাদেরকে নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। নিষ্পেষিত মানুষের রক্তে গড়ে ওঠে অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা। আজকের পশ্চিমা সভ্যতা যে তথাকথিত সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের (Multiculturalism) প্রলাপ করে, তার শেকড় দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীজুড়ে তাদের শোষণের নিদর্শন হিসেবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে এর প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ গড়ে ওঠে। শতাব্দীর শেষদিকে ফরাসি বিপ্লব সামাজিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দেয়। সামাজিক বিভাজন ও শোষিত শ্রমিক শ্রেণির অধিকারকে কেন্দ্র করে ঊনবিংশ শতাব্দী জুড়ে নানা ধাঁচের বিপ্লব ও আন্দোলন গড়ে ওঠে।
১৮৮৬ সালে শিকাগো শহরে কর্মঘণ্টা নির্ধারণ ও শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে। পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহতের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সচেতনতা তৈরি হয়। দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ ও শ্রমিক সুরক্ষার দাবিতে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় ‘পহেলা মে’ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে মে দিবস।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকালে বাংলার নিজস্ব শিল্পের বিপরীতে উপনিবেশিক ব্রিটেনের স্বার্থে ইউরোপীয় ধাঁচের শিল্প গড়ে ওঠে। বাংলার ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও বস্ত্রশিল্পের বিলুপ্তি ঘটে। ঐতিহ্যের মসলিন ও তাঁতশিল্প হুমকির মুখে পড়ে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক স্বার্থে আদি শিল্পের বিপরীতে নীল চাষ, পাটকল, চা চাষ, চিনিকল ও রেল ব্যবস্থার প্রবর্তন ঘটে।
সময়ের সাথে বাংলার কৃষিভিত্তিক আর্থসামাজিক কাঠামো আধুনিক বাংলাদেশে শিল্পনির্ভর আর্থসামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে নানামুখী শিল্প।United Nations University এর Centre for Policy Research এর তথ্যমতে বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। দেশের মোট জিডিপির ২০ শতাংশের উৎস তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রায় ১০ শতাংশ আসে প্রবাসী শ্রমিকদের মাধ্যমে।
শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশের ফলে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার ও শ্রম রপ্তানির মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমবাজার তৈরি হয়েছে। শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন ও ব্যবহার পূর্বক শ্রমিকের অধিকার সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালা ও সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।
প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি শ্রমিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উপযুক্ত শ্রমমূল্য নির্ধারণ করে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যে প্রশিক্ষণ ও বাজার উপযোগী শ্রমশক্তি রপ্তানি করতে না পারায় শ্রম রপ্তানিকারী অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ফলে মজুরি ও বাজার হারানোর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও হতাহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনে স্থানীয় নীতিমালা ও তদারকি না থাকায় শ্রমিকদের দুর্দশা থামছে না। দ্যা ডেইলি স্টার এর তথ্যমতে ২০১৩ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার প্রবাসী শ্রমিক বিদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন। এসব শ্রমিকের পরিবারের যথাযথ পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও লক্ষ্য করা যায়নি।
উপনিবেশিক শাসনামলে বাংলায় বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠে চা শিল্প। চট্টগ্রামের পার্বত্য ও সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগানের বিস্তৃতি ঘটে। উৎপাদিত চা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সবচেয়ে কম মজুরিতে কাজ করে চা শ্রমিকরা। বংশপরম্পরায় কাজ করে আসা চা শ্রমিকদের প্রায় ৭৫ ভাগ নারী। দরিদ্র ও অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্র এখনো কার্যকর নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেনি। শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের স্বাভাবিক প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ায় গোষ্ঠী হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করছে চা শ্রমিকরা। বিভিন্ন সময়ে চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। ২০২২ সালে তীব্র আন্দোলনের মুখে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অন্যান্য শ্রমিক সুরক্ষা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। প্রায় অর্ধকোটি শ্রমিক এই খাতে নিয়োজিত। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা গড়ে না উঠায় বিশাল এই জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে। ন্যূনতম মজুরি ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ, সাপ্তাহিক ছুটি, উৎসব ভাতা, কর্মপরিবেশ ও হতাহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন মৌলিক দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনে যায় পোশাক শ্রমিকরা। আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি ও ক্রেতাদের এসব বিষয়ে বাধ্যবাধকতা থাকলেও শিল্পমালিক ও সরকারের অব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের স্বার্থ বিঘ্নিত হয়ে আসছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ থাকলেও শিশুদের শিক্ষা সুরক্ষা নিশ্চিত না করে শ্রমে নিয়োগ করা হচ্ছে। শিশুদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। শ্রমিক সমাজের শিশুদের উপযুক্ত শিক্ষা সহায়তা ও প্রতিষ্ঠান না থাকায় শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়া নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে।
তাজরিন ফ্যাশন অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, বিএম ডিপো অগ্নিকাণ্ড ও প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও হতাহত হওয়ার পরবর্তী পুনর্বাসন তৎপরতা পর্যালোচনা করলে ঐতিহাসিক শ্রমিক শোষণের বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়।Health and Safety International এর তথ্যমতে বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ১১৯০ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন। এসকল হতাহতের প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন লক্ষ্য করা যায় নি।
শিল্প বিপ্লব পূর্ববর্তী সময় থেকেই উৎপাদনের নেশায় মত্ত থাকা পুঁজিপতিদের শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। শ্রমিকের রক্ত ও ঘামে গড়ে উঠছে পুঁজিবাদীদের বিশাল সাম্রাজ্য। শতাব্দীকালের শ্রমিক আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ শ্রমপরিবেশ ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি। শোষণের মাধ্যমে সাম্রাজ্য গড়ে তোলার বাহন হিসেবে শ্রমিক সমাজ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এই সংকট সমাধানে বিভিন্ন মতাদর্শ ও মতবাদ গড়ে উঠলেও এর সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি।শ্রম সমস্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক কনভেনশন, চুক্তি ও নীতিমালা থাকলেও তা সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।আইএলও বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার নিয়ে রাষ্ট্র, মালিক পক্ষ ও শ্রমিক ইউনিয়ন সমূহের মাঝে কাজ করছে দীর্ঘকাল ধরে। রাষ্ট্র ও সমাজে শ্রমিকের সমমর্যাদা, মালিক-শ্রমিকের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, আল্লাহভীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সভ্যতার সৃষ্ট এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।একইসা্থে শ্রম আইনের কার্যকর ব্যবহার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা ও শ্রমিক সুরক্ষায় নীতিমালার প্রয়োগ শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ইনসাফ ভিত্তিক মানবিক মর্যদার শ্রেণিহীন সমাজ কাঠামো এই সমস্যা সমাধানে অনিবার্য ।
Discussion about this post