ইতালীয় দার্শনিক Umberto Eco তার ‘Ur-Fascism’ নামক একটি প্রবন্ধে চিরায়ত ফ্যাসিবাদের ১৪টি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো Disagreement is treason, অর্থাৎ ভিন্নমত মানে রাষ্ট্রদ্রোহ। ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে দমন করা ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য। কারণ ফ্যাসিবাদ মনে করে ভিন্নমত বা বিরোধিতা থাকলে ক্ষমতার স্থায়িত্ব থাকবে না। এই চরিত্র আমরা বর্তমান সরকারের মধ্যে দেখতে পেয়েছি কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে। যেমন ২৬ মার্চ ২০২৬ (রাত) ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল, ২০২৬) ভোর রাতে ফেসবুকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতাকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে ঠাকুরগাঁওয়ে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার ফেসবুকে তারেক রহমানকে নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার দেওয়ার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মী বিবি সাওদা সুমিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরকম ঘটনা মোটামুটি নিয়মিত ঘটছে।
ফ্যাসিবাদ ভিন্নমতকে দমন জায়েজ করতে হাজির করে ‘আমরা বনাম তারা’ (Us versus Them) নীতি। অর্থাৎ একমাত্র আমরাই ভালো, বিরোধীরা খারাপ। বিরোধীরা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। আমাদের দেশে সরকারদলীয় বুদ্ধিজীবীরা সবসময়ের মতো এখনো বিরোধীদের কৌশলে হত্যাযোগ্য করতে উঠে পড়ে লেগে গেছে। এই সরকারদলীয় বুদ্ধিজীবীরা বিপক্ষ শক্তিকে অযোগ্য, দেশবিরোধী, বিপজ্জনক ইত্যাদি টার্ম ব্যবহার করে ‘আমরা বনাম তারা’ নীতির প্রতিফলন ঘটায়।
আমরা দেখেছি অতীতের ফ্যাসিস্টরা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে অন্যতম সহকারী ছিল ‘আসন্ন ভয়ংকর বিপর্যয়ের ধারণা’ (Armageddon Complex) ধারণা। এখনো ঠিক তার আভাস পাওয়া যায়। কিছুদিন আগে সংসদের হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান একটি মসজিদে গিয়ে বলেছিলেন, “দুই মাসের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঢাকা ছাড়তে হবে।” এই যে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, এরই নাম Armageddon Complex theory, অর্থাৎ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ফ্যাসিবাদ সৃষ্টির এবং এটাকে স্থায়ী করার কৌশল।
জাতীয়তাবাদ হলো ফ্যাসিজম সৃষ্টির অন্যতম উপকরণ। বিগত ফ্যাসিবাদের মৌলিক বয়ান ও দর্শন বাঙালি জাতীয়তাবাদ। জুলাই পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মুখ থুবড়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক জমিদার গোষ্ঠী নতুন শাসক গোষ্ঠীর আনুকূল্যে নিজেদের আবারও সক্রিয় করেছে। আর সেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলে তো সোনায় সোহাগা। কেন এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদ সৃষ্টির অন্যতম উপকরণ?
্এবার দেখা যাক, এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনা কী কী করেছে। বাঙালী জাতীয়তাবাদ এমন একটি সংবিধান রচনা করেছে, যেটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে প্রতিনিধিত্ব না করে বরং আমাদের মাঝে জাতিগত বিভেদ তৈরি করেছে। দেশপ্রেমের ধোয়া তুলে ব্যাংক লুটপাট থেকে শুরু করে বাকশাল কায়েম, পিলখানা ট্র্যাজেডি থেকে শুরু সাঈদীর রায়-পরবর্তী গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, তিন তিনবারের ডামি নির্বাচন, সর্বশেষ ২৪-এর গণহত্যা এসব ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়। এই জাতীয়তাবাদ হলো সেই জাতীয়তাবাদ, যা এখানকার জনমানুষের দৈনন্দিন চেতনার বিপরীত। স্বাধীনতার পর যে সরকার এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনা ধারণ করেছে, বাংলাদেশে সে ফ্যাসিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন দাবি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, মুজিব থেকে হাসিনা।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক গুরু হলো Rabindranath Tagore। যার চিন্তা ও দর্শনের অনুসারী গোষ্ঠী তীব্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক ও বাহক। বর্তমান সরকার ও তার বুদ্ধিজীবী মহল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের চেয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান ও অনুসারীদের চিন্তা বাস্তবায়নেই অধিক মনোযোগী মনে হচ্ছে।
ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বা নিদর্শন হলো লুটপাট ও লুটপাটকারীদের সহযোগিতা। বিগত সময়ে ব্যাংক খাত ও অন্যান্য খাতে ব্যাপক লুটপাটকারীদের সহায়তা বা আবারও স্বাভাবিক কার্যক্রমে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের এমন আচরণ ও নীতি, পুরোনো ফ্যাসিবাদী তরিকায় পুনর্যাত্রা যা, মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
ভিকটিম রোল প্লে করা এটি শুধু ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য নয়, এটি জায়নবাদেরও বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ জুলুম করেও নিজেদের মজলুম হিসেবে উপস্থাপন করা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা জুলাইয়ের আহত ও শহীদদের প্রতি ভয়ংকর জুলুম। এই জুলুমকে তারা কাউন্টার দেয় “জুলাইতে ওয়াসিম শহীদ হয়েছে, বিএনপি সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কই আমরা তো জুলাই বিক্রি করি না” এসব কথা দিয়ে। ঠিক একইভাবে হাসিনা ১৫ আগস্ট দিয়ে সবকিছু জায়েজ করত।
মিডিয়ার একচ্ছত্র আনুগত্য পুঁটি মাছের খবর দিয়ে রাঘব বোয়ালের খবর চাপা দেওয়া। দেশে এখন নিয়মিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। দেখবেন, এগুলো নিয়ে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নীরব থাকে। তারা সরব থাকে তারেক রহমানের বিড়ালকে নিয়ে, তারেক রহমান সিনেমা দেখতে যাচ্ছে এসব নিয়ে। সরকারদলীয় বুদ্ধিজীবীরা শিখায় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন (Rearrangement of Perception)। অর্থাৎ নিজের বেলায় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি নিজের মতোই থাকবে।
Mahmudur Rahman ২০১৩ সালে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, “ফ্যাসিবাদের গন্ধ পাচ্ছি।” পরবর্তীতে দেখেছি ফ্যাসিবাদ কী জিনিস। সুসংবাদ হলো এখনো কেউ এমন কথা বলেনি। ফ্যাসিবাদের লক্ষণ বোঝার জন্য, অথবা নতুন ফ্যাসিবাদ তৈরি হচ্ছে কিনা বোঝার জন্য শাসকের মধ্যে ফ্যাসিবাদের সব বৈশিষ্ট্য থাকা বাধ্যতামূলক নয়। যার মধ্যে ফ্যাসিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য আছে, তাকেও ফ্যাসিবাদী বলা যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোকে আমরা George Orwell-এর একটি উপন্যাসের সাথে বিষয়টি কানেক্ট করতে পারি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা যে পার্টি চালায়, সে পার্টির নাম ইংলিশ সোশ্যালিস্ট পার্টি (রূপকভাবে)।
অরওয়েলের উপন্যাসের মধ্যে যে রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে, সেখানে চারটি মন্ত্রণালয় আছে। মন্ত্রণালয়গুলো হলো Ministry of Truth, Ministry of Peace, Ministry of Love, এবং Ministry of Plenty। এসব মন্ত্রণালয়ের প্রতিটির কাজ তাদের নামের সম্পূর্ণ উল্টো। যেমন শান্তি মন্ত্রণালয়ের কাজ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, সত্য মন্ত্রণালয়ের কাজ মিথ্যা ও প্রপাগান্ডা ছড়ানো, ইতিহাসের উপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, অতীতের নথি পরিবর্তন করা; আর ভালোবাসা মন্ত্রণালয়ের কাজ ছিল ঘৃণা ছড়ানো ও নির্যাতন চালানো।
ফ্যাসিবাদ হলো রাজনৈতিক মতাদর্শ, আবার ব্যক্তির মানসিকতাও। এটা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবেও কাজ করে। ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন ধরনের রূপ নিয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে।
অ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post