৩ কোটি নাগরিকের দেশ নেপাল। হিমালয় পর্বতের সৌন্দর্যে ভরপুর নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাস খুব একটা সুখকর নয়। একসময়ের রাজতান্ত্রিক শাসনের নেপালে দীর্ঘদিনেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠেনি। ১৯৯০ সালের পর এখন পর্যন্ত ৩২টি ভিন্ন ভিন্ন সরকার নেপালকে শাসন করেছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগে জন-অসন্তোষের ফল হিসেবে ২০২৫ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন সরকারের।
জেন-জি (এবহ-ত) বিপ্লবের পর নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন গতিপথ তৈরি হয়। গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি, তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আকাঙ্ক্ষা নেপালের রাজনৈতিক বলয়ে নতুন দিক উন্মোচন করেছে। সর্বশেষ নির্বাচনে ওল্ড গার্ডের বিপরীতে নিউ গার্ডের ভূমিধস বিজয় হয়। নেপাল কংগ্রেস, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (টগখ) ও নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির শাসনের পর তরুণদের দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’র শাসনকাল অপেক্ষা করছে নেপালিদের জন্য।
নেপালের গণঅভ্যূত্থানের পর নির্বাচনে তরুণদের দলের বিজয় হলেও বাংলাদেশের গণঅভ্যূত্থানের পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেনি বাংলাদেশের তরুণদের দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)। ফলে বিভিন্ন মহলে এ বিষয় নিয়ে হচ্ছে নানা আলোচনা সমালোচনা। নেপালের মতো বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায়ও তরুণদের নেতৃত্বে গণঅভ্যূত্থান হলেও ভিন্নতা ছিলো প্রেক্ষাপটে। এই ভিন্নতা বুঝতে হলে এই গণঅভ্যূত্থানগুলোর পারিপার্শিক দিকগুলো বুঝা দরকার।
নেপালের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের নেপালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (টগখ)। দক্ষিণ এশিয়ার দুর্বলতম অর্থনীতির দেশ নেপাল। দেশটির জিডিপির এক-তৃতীয়াংশের উৎস রেমিট্যান্স। পর্যটনের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক খাত তৈরি করতে না পারায় বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। ২০ শতাংশের বেশি বেকারত্ব এবং ২০.৭৩ শতাংশ নাগরিক বাস করেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক খাতসমূহ স্বল্পসংখ্যক শক্তিশালী ও বিত্তবানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নেপালি তরুণদের হতাশা তীব্র আকার ধারণ করে। আন্দোলনে নেপালি বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক ও অলিগার্কদের (সামজের রাঘবোয়াল) সন্তানদের ‘নেপোকিড’ হিসেবে আখ্যা দেয়। হলিউডের সেইসব তারকাদের পারিবারিক পরিচয়ে বিভিন্ন সুযোগ পাওয়া তাদের সন্তানদের ‘নেপোবেবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আর এ ধারণাকে নেপালের গণঅভ্যূত্থানে ‘নেপোকিড’ হিসেবে ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা।
এসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করায় ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করে নেপাল সরকার। এর প্রতিবাদে সোচ্চার হয় নেপালি তরুণরা।
বিক্ষোভের ডাক ও সরকারের পতন
৮ সেপ্টেম্বর নেপালি তরুণরা কাঠমান্ডুতে নেপাল ফেডারেল পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভের ডাক দেয়। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নিলেও তা আর শান্তিপূর্ণ থাকেনি। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা পার্লামেন্ট ভবনের মূল অংশে প্রবেশ করতে চাইলে বাধা সৃষ্টি হয়। ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীরা সামনে এগোলে টিয়ারগ্যাস, জলকামান, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে পুলিশ। আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্ট ভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করে মূল ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিক্ষোভ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো কাঠমান্ডুতে। প্রধানমন্ত্রীর ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসের দখল নেয় বিক্ষোভকারীরা। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে ৭৩ জন নেপালি প্রাণ হারান এবং ২০০০-এর অধিক আহত হন। পরের দিন কে পি শর্মা অলি পদত্যাগ করেন এবং নেপালি রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। সংস্কারপন্থীদের নিয়ে সরকার গঠন করেন কার্কি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন সুশীলা কার্কি।
তরুণদের রাজনৈতিক দল
পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তে অতিষ্ঠ নেপালি জনগণের সামনে হাজির হয় রবি লামিচানের গঠিত রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (জঝচ)। ২০২২ সালে গঠিত হয়ে সর্বশেষ নির্বাচনে ২১টি আসন লাভ করে। সেই অর্থে গণঅভ্যুত্থান-সৃষ্ট রাজনৈতিক দল না হলেও তরুণদের সবচেয়ে কাছের ও অভ্যুত্থানপন্থী দল হিসেবে নির্বাচনে জনগণের সামনে বিকল্প হিসেবে হাজির হয় আরএসপি। নেপালি তরুণদের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ও কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ (বালেন) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরএসপিতে যোগ দিলে তারুণ্যের সমস্ত জোয়ার আরএসপিতে এসে পৌঁছায়। অন্যান্য দলগুলোতেও তরুণদের উপস্থিতি থাকলেও তা মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রাজনৈতিক সংস্কার
বেকারত্ব, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি থেকে মুক্তির দাবিতে রাজনৈতিক পরিসরেও নানা পরিবর্তন ঘটে। বিশাল আকারে নেপালি কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ সংস্কার করেন গগন থাপা। তরুণদের প্রাধান্য দিয়ে নেতৃত্ব ও দলীয় সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনে অন্যান্য দলগুলোও।
নির্বাচন
কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র ও র্যাপার বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে একচ্ছত্র বিজয় লাভ করে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। ৩৫ বছর বয়সী বালেন রাজনৈতিক এলিটদের বিপক্ষে এবং তরুণদের একচেটিয়া সমর্থন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অপেক্ষায়। ১৬৫টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনে জয়লাভ করে আরএসপি। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (UML) ৯টি এবং নেপালি কংগ্রেস ১৮টি আসনে জয় লাভ করে। ১১০টি পিআর আসনের মধ্যে ৫৬টি আসন পায় আরএসপি।
নির্বাচনে তারুণ্য
অনূর্ধ্ব ৩০ বছরের ১১ জন, ৪০ বছরের ৪১ জন ও ৫০ বছরের ৪৩ জন আরএসপি নেতা নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৩ জন তরুণ নারী আরএসপি থেকে জয়লাভ করেন। নির্বাচনে আরএসপিসহ ৭০ জন জেন-জি এবং ৪০-এর কম বয়সী ২৬০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে ৬১ জন বিজয়ী হন। ৫৭ জন প্রার্থী বিজয় লাভ করেন যাদের বয়স ৫০-এর নিচে। ১৬৫ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২০ জন তরুণ বিজয়ী হওয়া নেপালি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং পুরোনো রাজনৈতিক বলয়ের পরাজয়ের বাস্তবতা ইঙ্গিত করে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও পার্থক্য
জেন-জি বিপ্লবে নেপালের সরকারের পতন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়। এর আগে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও স্বজনপ্রীতির প্রেক্ষাপটে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে সরকারের পতন হয়। এরপর ২০২৪ সালে বাংলাদেশে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও স্বজনপ্রীতির পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে কোটা ও দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রতিরোধে তরুণদের অভূতপূর্ব বিক্ষোভে হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পক্ষান্তরে মাত্র দুই দিনের আন্দোলনে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও স্বজনপ্রীতির কারণে একই কায়দায় নেপালে পতন হয় কে পি শর্মা অলির সরকারের।
বিক্ষোভের ধরণ
শ্রীলঙ্কায় সরকারবিরোধী আন্দোলন এই তিনটির মধ্যে সবচেয়ে কম রক্তক্ষয়ী ছিল। সপ্তাহব্যাপী আন্দোলনে ৯ জন শ্রীলঙ্কান নাগরিক নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হন। জনগণ সরকারি অফিস, পার্লামেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীদের ভবন দখল করে তাদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে।
নেপালের জেন-জি আন্দোলনে আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্ট ভবন থেকে সরকারি অফিস দখলের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করে এবং তীব্র মারমুখী ভঙ্গিতে অন্যান্য স্থাপনায় আক্রমণ করে। ২২ জন আন্দোলনকারীসহ ৭৬ জন নেপালি নিহত হন।
বর্বরতায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল বাংলাদেশ। প্রায় ৩৬ দিনের আন্দোলনে ২১৫ জন ছাত্র, ১১৭ জন শিশুসহ ২০০০ বাংলাদেশি আন্দোলনকারী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের হাতে নিহত হন। সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষয়ী হলেও কম রাষ্ট্রীয় স্থাপনা দখল ও প্রতিশোধস্পৃহা বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানকে অন্যান্য গণঅভ্যুত্থানের তুলনায় বিশেষায়িত করেছে।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা
নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় প্রধান সমস্যা ছিল বেকারত্ব, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি। অন্যদিকে বাংলাদেশের আন্দোলনে দীর্ঘ ১৭ বছরের একদলীয় শাসন, বিরোধী দল ও মতের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, ভারতীয় আধিপত্যবাদের তীব্র উপস্থিতি, নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নির্যাতনমূলক আধিপত্য এবং সরকারি চাকরিতে অন্যায্য কোটা পদ্ধতি জনবিক্ষোভের সৃষ্টি করে। সরকারের বলপূর্বক শাসনের মানসিকতা ও নাগরিকদের জননিরাপত্তাকে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতার ফলে দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ দিতে হয়।
রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তন ও তরুণদের উত্থান
নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় দীর্ঘদিনের পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত একই বৃত্তে আবদ্ধ থাকায় সেখানে বিকল্প হিসেবে জনগণ তরুণদের বেছে নেয়। পাশাপাশি এই দুই আন্দোলন ছিল তরুণদের তৈরি এবং তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আন্দোলন ছিল ফ্যাসিবাদী এস্টাবলিশমেন্টের বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মত ও গোষ্ঠীর সঙ্গে তরুণদের যৌথ অংশগ্রহণের ফল। ফলে নতুন ও পুরোনোর যৌথ প্রচেষ্টায় গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্পূর্ণ অংশ গণঅভ্যুত্থানপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে তারুণ্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তি উভয়ই জনগণের সমর্থন অর্জন করে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা
সবগুলো আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে সোশ্যাল মিডিয়া। নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করার প্রতিবাদে তরুণরা কাঠমান্ডুতে তীব্র বিক্ষোভের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে এটি গণবিক্ষোভকে আরও ত্বরান্বিত করে। সোশ্যাল মিডিয়া জনমত গঠন ও প্রতিবাদের শক্তিশালী বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।
নতুন সরকারের যাত্রা
২৭ এ মার্চ শুক্রবার কাঠমান্ডুতে শপথ নিয়েছে বালেন্দ্র শাহ নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। ১৫ জনের মন্ত্রী পরিষদে তরুণদের আধিপত্য নির্বাচনের ফলাফলের মতোই বহাল রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০ টি আসনে প্রতিদ্বন্দীতা করে ৬ টি আসনে জয়লাভ করেছে বাংলাদেশের তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপি ক্ষমতায় না গেলেও বিরোধী জোটে থাকায় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইতিবাচক ভুমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে তাদের।
জেন-জি বিপ্লবের ছোঁয়া পরবর্তীতে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনেও ছড়িয়ে পড়ে। পুরোনো ব্যবস্থার বিপরীতে নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় তারুণ্যের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্মেষ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কেমন প্রভাব ফেলে, তা সময়ই বলে দেবে।
অ্যানালাইসিস টিম/ এএনবিডি
Discussion about this post