ইরানের চলমান সংঘাত এবং যুদ্ধের মাঝেই শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়। আমেরিকার ইচ্ছেকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর ছেলে মুজতবা খামেনীকে নির্বাচন করা হলো।
বহু বছর ধরে পর্দার আড়ালে থেকেই নীরবে কাজ করে গেছেন—মুজতবা খামেনী। তিনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনীর দ্বিতীয় বড় ছেলে।
১৯৬৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের শহর Mashhad-এ ওনার জন্ম। জন্মের বছর দশেক পরই ১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনি’র নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো আমূল বদলে যায়। ১৯৮০–১৯৮৮ সালের ভয়াবহ ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। সেই সময় তিনি এলিট একটি ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেন। এই যুদ্ধই নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে, এবং অনেক তরুণ যোদ্ধার মতো মুজতবা খামেনীর জীবনেও এর প্রভাব পড়ে।
যুদ্ধের পর তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পথে এগিয়ে যান। ১৯৯৯ সালে তিনি পাড়ি জমান পবিত্র শহর Qom-এ। সেখানে তিনি একজন আলেম হিসেবে পড়াশোনা করেন এবং ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবেও কাজ শুরু করেন। বলা হয়, এই সময় তিনি কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ধর্মীয় চিন্তাবিদদের অধীনে পড়াশোনা করেছিলেন।
কিছু বছর পর তিনি আবার তেহরানে ফিরে আসেন এবং তার বাবা আলী খামেনির কার্যালয়ে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি চলে আসেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি পর্দার আড়াল থেকেই রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। রাজনীতির ময়দানেও তার উপস্থিতি দেখা যেতে শুরু করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ এর ২০০৫ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর ইরানে বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত কঠোরভাবে দমন করা হয়।
বহু বছর ধরে মুজতবা খামেনিকে অনেক বিশ্লেষক “পর্দার আড়ালের শক্তিশালী মানুষ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। জনসমক্ষে তাকে খুব বেশি দেখা না গেলেও দেশের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ করে Islamic Revolutionary Guard Corps-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় যাত্রার মধ্য দিয়েই মুজতবা খামেনি ধীরে ধীরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগিয়ে আসেন। আর আজ, নানা অস্থিরতা ও সংকটের মাঝেই তিনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
রক্ষণশীল ধর্মীয় পন্ডিতদের সান্নিধ্যে থাকা, কট্টরভাবে আমেরিকা বিরোধী আহমেদিনেজাদের জন্যে প্রচারণা চালানো এবং রেভিউলশনারি গার্ডসের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সব মিলিয়ে বলা যেতেই পারে- আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীর থেকেও বড় আমেরিকা বিরোধী মানুষকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করা হলো। পারিবারিক উত্তরাধিকারের কথাও অনেকে তুলতে পারেন, তবে সবকিছু ছাপিয়ে নিঃসন্দেহেই বলা যায় যোগ্য ব্যক্তির হাতেই ক্ষমতা এসেছে।
এইবার কতটা সফল হতে পারেন তিনি, সেটিই দেখার বিষয়। আল্লাহ তাকে সফলতা দান করুন, এটাই কামনা।
মবিন মজুমদার
Discussion about this post