মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ যত বাড়ছে, ততই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। ইরান, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ঘিরে তৈরি হওয়া সংঘাত আপাতদৃষ্টিতে আঞ্চলিক মনে হলেও হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এই অস্থিরতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বিশেষ করে কাতার, কুয়েত, আরব-আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানে আমেরিকান ঘাঁটিতে ইরানি হামলার ফলে বাংলাদেশী প্রবাসাী শ্রমিকেদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল শোধনাগারে হামলা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশংকা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা
বিশ্ব জ্বালানি বাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেলের উৎস। প্রায় ২৫ ভাগ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আসে এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই। ৪০ কিলোমিটার প্রশস্ত হরমুজ প্রণালী এই তেল সরবরাহের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার হয়। সংঘাত শুরুর পর জ্বালানি তেলের মূল্য ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
অন্যদিকে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিন্ম তেল মজুদ রয়েছে বাংলাদেশের। ৩০-৩৫ দিনের তেল এবং ১০-১১ দিনের ডিজেল মজুদ থাকার কথা সরকারি সুত্র জানিয়েছে। যেখানে ভারতের ৭৪ দিন, ভিয়েতনামের ৪৫ দিন ও থাইল্যান্ডের ৬১ দিনের তেল মজুদ রয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বিতরণকারী সংস্থা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার পরিকল্পনা ঘাটতি সংকটকে আরো ঘনীভূত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা এতে আরও দেশ জড়িয়ে পড়ে, তবে তেলের দাম দ্রুতই বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটাতে পারে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। ফলে বিশ্ববাজারে দামের প্রতিটি ওঠানামাই সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি নতুন করে বাজার অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে এর প্রভাব আরও দ্রুত অনুভূত হবে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধ তীব্র হলে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়া উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে।
রেমিট্যান্স খাতেও অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল জ্বালানি নির্ভরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অঞ্চল বাংলাদেশের শ্রমবাজারেরও একটি বড় কেন্দ্র। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে ৫০ লক্ষের বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিক কাজ করছেন।
যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি বিস্তৃত হয় কিংবা ওই অঞ্চলের অর্থনীতি অস্থির হয়ে ওঠে, তবে প্রবাসী শ্রমবাজারেও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে কিংবা অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও তার প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এই রেমিট্যান্স। বাংলাদেশের অর্জিত রেমিট্যান্সের ৫০ শতাংশের উৎস উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশগুলো। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও চাপে পড়তে পারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা রপ্তানি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সংকটে মানবিক স্থিতিশীলতাও বিঘ্ন হতে পারে। ইতিমধ্যে কুয়েতে দুই বাংলাদেশি প্রবাসী ইরানি হামলায় নিহত হয়েছেন। প্রায় অর্ধকোটি প্রবাসীর পরিবারও তাদের প্রিয়জনের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ ইতোমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বড় আকার ধারণ করলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল ও আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তেলের দাম বাড়লে সরকারকে হয় বেশি ভর্তুকি দিতে হবে, নয়তো জ্বালানির দাম বাড়াতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই এর চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত আগাম পরিকল্পনা নেওয়া। জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো ও বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post