মানবজাতির ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে তিনটি শিকড় এর সর্বত্র খুঁজে পাওয়া যায়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দন্দ্ব, ন্যায্যতা-অন্যায্যতার হিস্যা এবং উভয়ের স্বার্থেই বন্দীদশা থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা। এই দান্দ্বিক প্রতিফলন আমরা ১৮শ শতাব্দীর ফরাসি বিপ্লব থেকে ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের বয়ানের মধ্যেও দেখতে পাই আবার ৭ম শতাব্দীর বদর যুদ্ধ থেকে ইসলামী সভ্যতার বয়ানের মধ্যেও সমানতালে দেখতে পাই। মূলত বলা যায় ইতিহাসের প্রতিটি খন্ডচিত্রে এই ইমান, ইনসাফ ও ইনকিলাব এর পর্যবেক্ষণ হাজির থাকে।
ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধকে হাল আমলে সাধারণত একটি রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। জনপ্রিয় বর্ণনায় এটি ৩১৩ জন মুসলমানের অলৌকিক বিজয়ের গল্প, অথবা নবীন মুসলিম সমাজের প্রথম সামরিক সাফল্য। কিন্তু বদরকে যদি কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়, তবে এর প্রকৃত অর্থের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। বাস্তবে বদর ছিল এক বহুমাত্রিক ঘটনা, যেখানে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, নৈতিকতা এবং এমনকি মেটাফিজিক্যাল বাস্তবতাও একসাথে উপস্থিত।
আজকের সমাজে বদরের আলোচনা প্রায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ক্ষমতার রাজনীতি বা সামরিক কৌশলের মধ্যে। অথচ ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, বদর ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন সভ্যতার আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত। ইবনে খালদুনের মতে একটি সভ্যতায় মানুষের সমাজগতভাবে বসবাস স্বীয় ইচ্ছাধীন কোনও বিষয় নয় বরং অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। ফলে বলা যায়, মদিনায় ততকালীন মুসলমানদের সামাজিক জীবনের অত্যাবশকীয় বিষয়ের ফলাফলস্বরূপ এই বদর ঘটনা অনিবার্য হয়ে উঠেছে, যা তাদের স্বীয় ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় নয়। এভাবে দেখার অর্থ হলো বদরকে একটি মেটাফিজিক্যাল বিষয় হিসেবে দেখা এবং অন্টোলজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা।
সমাজে যখন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন হাজির হয় এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের স্বকীয় চিন্তার দিক দ্বান্দ্বিকতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মূলত তা একটি সম্পদের বন্টিত হওয়ার দিকটিকে প্রকট করে তোলে। ইতিহাসে প্রায়ই রাজনৈতিক সংঘর্ষের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে। মক্কার সমাজও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কাবার ধর্মীয় মর্যাদা এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিরাপত্তা দিয়েছিল। কুরাইশদের অর্থনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল কাবাকে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কাফেলা। যেহেতু কুরাইশরা কাবার রক্ষক, তাই আরবের অন্যান্য গোত্র তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে সাধারণত আক্রমণ করত না। অর্থাৎ ধর্মীয় কর্তৃত্ব কুরাইশদের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তৈরি করেছিল। বদর যুদ্ধের মূলে অর্থনৈতিক সমীকরণ ছিল সুগভীর। মক্কার কুরাইশদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সিরিয়া ও ইয়েমেনের সাথে তাদের দীর্ঘপাল্লার বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্যের প্রধান রুটটি ছিল মদিনার ভৌগোলিক সীমানার ঠিক পাশ দিয়ে। মুসলিমদের জন্য এটি কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না, বরং ছিল নিজেদের হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের একটি বৈধ সংগ্রাম। মক্কায় ত্যাগ করে আসা মুসলিমদের স্থাবর-অস্থাবর যে সম্পদ কুরাইশরা বাজেয়াপ্ত করেছিল, তা তারা সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক কাফেলায় বিনিয়োগ করে মুনাফা লুটেছিল। ফলে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন ১,০০০ উটের সেই বিশাল কাফেলাটি আটক করা ছিল মুসলিমদের জন্য একটি ‘অর্থনৈতিক পাল্টা-অবরোধ’। কুরাইশরা বুঝতে পেরেছিল, এই বাণিজ্যিক রুট যদি একবার মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে মক্কার অর্থনীতি ধসে পড়বে। এই অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই তারা ১,০০০ সুসজ্জিত সৈন্য নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নামে। বদরের বিজয় কেবল মক্কার সামরিক দম্ভকে চূর্ণ করেনি, বরং তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থবিরতা নামিয়ে এনে মদিনাকে আরবের নতুন অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত করেছিল। এই যুদ্ধই প্রথম প্রমাণ করে যে, একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার ভৌগোলিক বাণিজ্যের চাবিকাঠি নিজের হাতে থাকা কতটা অপরিহার্য।
বদরের সাথে রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক বাস্তবতার মেলবন্ধন প্রগাঢ় কারণ হিজরতের পর মদিনায় মুসলমানদের প্রস্তাবনায় যে নতুন সমাজ গড়ে ওঠে তা কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল না। মদিনা সনদের মাধ্যমে রাসূল (সা.) একটি বহুগোষ্ঠী-ভিত্তিক সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেন যা আরবের জন্যই একটি নতুন মডেল হিসেবে দাঁড়ায় এবং ততকালীন মক্কার জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল এবং বদর সেই পরিবর্তনের প্রথম প্রকাশ।
সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বদরকে একটি নতুন সামাজিক শক্তির উত্থান হিসেবে দেখা যায়। মক্কার সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক যেখানে পরিচয়, মর্যাদা এবং ক্ষমতা নির্ধারিত হতো বংশ ও গোত্রের মাধ্যমে। কিন্তু ইসলাম একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা নিয়ে আসে তা হলো উম্মাহ। এখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় বিশ্বাসের মাধ্যমে, বংশের মাধ্যমে নয়।
ইবনে খালদুনের মতে, সমাজের শক্তির মূল ভিত্তি হলো “আসাবিয়্যাত” বা সামাজিক সংহতি। সাধারণ অর্থে আসাবিয়্যাত হলো মানুষের জীবনকে সমাজবদ্ধভাবে পরিচালনা করার প্রথম ধাপ এবং এমন এক সামাজিক সংহতি যেখানে পারস্পরিক আনুগত্য এবং একটি লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে শক্ত ঐক্য উপস্থিত।
বদরের প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের মধ্যে এই সংহতি তৈরি হয়েছিল বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে। অন্যদিকে কুরাইশদের ঐক্য ছিল মূলত বংশ, গোত্রীয় মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে বদর যুদ্ধ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল মূলত আদর্শভিত্তিক আসাবিয়্যাত এবং স্বার্থভিত্তিক আসাবিয়্যাত এর মধ্যবর্তী সংঘর্ষ।
পৃথিবীতে প্রতিটি সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেই এই ধরনের সামাজিক শক্তির সংঘর্ষগুলো অনিবার্য হয়ে উঠে এবং যে আসাবিয়্যাত’টি ধারাবাহিক প্রজন্মে শক্তিশালী গঠনগত ভিত্তি চলমান রাখতে পারে সেই আসাবিয়্যাত অন্যান্য আসাবিয়্যাতকে পরাজিত করতে পারে। বদরের ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবেই মুসলমানদের আদর্শভিত্তিক আসাবিয়্যাত কুরাইশের ১০০০ সৈন্যসংখ্যা থাকার পরেও স্বার্থভিত্তিক আসাবিয়্যাতকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।
প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তার আল-মুকাদ্দিমা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, একটি সমাজ মূলগতভাবে যেমন, ঠিক সেভাবেই বিকশিত হওয়ার জন্য অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দুইটি উপাদান রয়েছে। প্রথমটি হলো, ‘মানুষ যদি এমন একটি আচরণের মধ্যে থাকে যে, আমি যদি আমার নিকটবর্তীজনকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আমি নিজেও আমার নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারবো না’।
সমাজের মানুষ যদি এ ধরনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে আলোকে তাদের সমাজকে গড়ে না তুলে, তাহলে তারা একত্রে বসবাস করতে পারবে না। যেমন, মানবশিশু খুবই দুর্বল ও অসহায় হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। সমাজ যদি তাকে বড় হওয়া ও টিকে থাকার জন্য সাহায্য না করে, তাহলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। খালদুনের মতে এটি হচ্ছে ‘অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার নীতি’। সে নীতিটি হলো মানুষ মুসলিম হোক বা না হোক, তারা যেন একটি প্রজাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, সেভাবেই একে অপরকে রক্ষা করে থাকে।
বদরের প্রেক্ষিতে মদিনায় মুসলিমদের হিজরতের পর অস্তিত্ব রক্ষার নীতি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। কারণ হিজরতের আগে রাসূল সঃ বিভিন্ন অঞ্চলে বার্তা প্রেরণের পর মদিনা থেকে কেবলমাত্র আশ্রয়ের সাড়া মেলে। ফলে বিভিন্ন দিক থেকেই মুসলিমদের যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে উঠছিল। ফলশ্রুতিতে মদিনায় সকলে একমত হয়েছিল যে মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি নির্বিশেষে সকলে একে অপরকে রক্ষা করতে হবে।
দ্বিতীয়টি হলো, একটি সমাজ হিসেবে মানুষের টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশকেও মানুষের বাসোপযোগী হতে হবে। পরিবেশ যদি মানুষের বসবাসের উপযোগী না হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকা সম্ভবপর নয়। যার কারণে মানুষ এবং প্রস্তাবনাহীন মরুভূমিতে কিংবা বরফাচ্ছাদিত অঞ্চলে উমরান বা সভ্যতা গড়ে উঠবে না। এই মূলনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী সভ্যতার সমাজ গঠনের জন্য মদিনা সনদ এক বৃহৎ প্রস্তাবনা। এবং এর আলোকে মদিনায় সকলকে নিয়ে একত্রে বসবাস উপযোগী শহর গড়ে তোলার জন্য বদর অনিবার্য হয়ে উঠে। এ দুটি মূলনীতি সভ্যতা বা উমরানের জন্য অপরিহার্য।
সমাজে মানুষের একসাথে বসবাস করার জন্য উপরোক্ত দুটি মূলনীতির সাথে ইবনে খালদুন তৃতীয় একটি মূলনীতি যুক্ত করেন। তিনি বলেন, যদি কোনো গোত্রের নিকট কোনো পয়গাম্বর আসে, তাহলে সে পয়গাম্বরের উম্মতের মধ্যে এমন একটি শক্তিশালী চেতনা থাকতে হবে, যে চেতনার বলয়ে তারা সকলকে রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাবে। আর সে প্রচেষ্টা হতে হবে এমন, যেমনটা একজন মা তার সন্তানকে রক্ষা করার জন্য করে থাকেন। এখানে সামাজিক অস্তিত্বের তৃতীয় মেটাফিজিক্যাল মূলনীতিটি মদিনার মুসলমানদের মধ্যে তখন রাসূল সঃ এর ‘নবুওয়ত’ হিসেবে উপস্থিত। একইসাথে এই পয়গাম্বরের ইত্তিবা বা অনুসরণকারীগণের শক্তিশালী বলয় সেই আসাবিয়্যাতকে নির্ধারণ করছিল যা মদিনায় একটি সমাজিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে।
অন্টোলজির দৃষ্টিতে বদরের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে একটি বিভাজনের আলাপ দৃশ্যমান হয় যা হচ্ছে সত্য-মিথ্যার বিভাজন। মুসলমানগণ বিশ্বাসের যে প্রস্তাবনা আরবে প্রথিত করতে চাচ্ছে তার সত্যতা যাচাই করা অনিবার্য হয়ে উঠে কারণ কুরাইশরাও তাদের বিশ্বাসকে সত্য হিসেবে দাবি করেছিল। জানা যায়, বদরের যুদ্ধে কুরাইশ নেতা আবু জাহেল অগ্রসর হওয়ার সময় সয়ং নিজেও খোদার নিকট ইচ্ছা ব্যক্ত করছিল যে এই যুদ্ধে যেন সত্যের বিজয় হয় এবং মিথ্যা বিশ্বাসের দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
মূলত তার কুরাইশদের আসাবিয়্যাতে প্রবল বিশ্বাস ছিল। বলা হয়, এই অন্টোলজিক্যাল প্রতিফলন বদরের যুদ্ধে ঘটেছে যে খোদায়ী শক্তির বহিঃপ্রকাশ তথা ফেরেশতা কতৃক সহায়তা ঘটেছিল। এই মাত্রার অর্থ হচ্ছে বদর যুদ্ধে দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যের সংযোগ ঘটেছে। যেমন মুসলমানগণ বিশ্বাস করেন, রাসূল সঃ এর মজলিসে একদিন জিবরাইল আঃ ব্যক্তিরূপে উপস্থিত হলেন এবং কথাবার্তা বললেন তারপর চলে গেলেন, যা উপস্থিত সাহাবিগণ সাক্ষী হওয়ার পর জানতে পেরেছিলেন তিনি মূলত একজন ফেরেশতা ছিলেন। এই বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে অদৃশ্য সাহাবিগণের দৃশ্যমান অবস্থার মধ্যে সংযোগ করেছে। তেমনি বদরের বিষয়টিও ইতিহাসের দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর সঙ্গে একটি অদৃশ্য মাত্রাও যুক্ত করে যা নৈতিক সত্যের একটি বৃহত্তর প্রকাশ।
বদরের যুদ্ধটি ছিল মূলত এক অসম শক্তির লড়াই। মক্কার কুরাইশদের কাছে ছিল উন্নত বর্ম, ১০০টি ঘোড়া এবং বিশাল রসদ যেখানে মুসলিমদের সম্বল ছিল মাত্র ২টি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। যুদ্ধের এই জয়-পরাজয় কেবল আরবের মরুপ্রান্তরের বালুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি আরবের দীর্ঘদিনের গোত্রীয় শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভকে চূর্ণ করে দিয়েছিল। মূলত বদরের আগে মদিনার মুসলিম সমাজকে আরবের শক্তিশালী গোত্রগুলো কেবল একটি ‘আশ্রিত গোষ্ঠী’ হিসেবে দেখত। কিন্তু বদর বিজয়ের পর মদিনা একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন সার্বভৌমত্বের আত্মপ্রকাশ ঘটায় এবং বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিনিধি দল মদিনার সাথে সন্ধি বা মিত্রতা করতে শুরু করে। একইসাথে ‘মদিনার সনদ’ বা লিখিত সংবিধান বাস্তবায়নের পথ আরও প্রশস্ত হলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়।
বদর যুদ্ধের পর গণিমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের যে ৮০:২০ নীতি প্রবর্তিত হয়, তা ছিল আরবের প্রচলিত লুটতরাজ সংস্কৃতির মূলে এক প্রচণ্ড কুঠারাঘাত। কুরআনের বিধানে নির্ধারিত এই বণ্টন ব্যবস্থা কেবল যুদ্ধের নিয়ম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘ন্যায়ভিত্তিক অর্থব্যবস্থার’ ভ্রূণ। যেখানে যোদ্ধাদের ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ৮০ শতাংশ ব্যক্তিগত মালিকানায় দেওয়া হয়, সেখানে অবশিষ্ট ২০ শতাংশ (খুমুস) জমা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। এই ২০ শতাংশ সম্পদই ছিল ইতিহাসের প্রথম ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’, যা সহায়হীনদের বরাদ্দস্বরূপ দিলেও মূল লক্ষ্য ছিল সম্পদকে অলস ফেলে না রেখে সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে দেওয়া। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো (যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ) নাগরিকদের জন্য যে ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার’ নিশ্চিত করে, বদরের এই ২০% ছিল তার আদি রূপ।
আজকের বিশ্বে সরকারগুলো ২৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত আয়কর নিয়ে থাকে। কিন্তু বদরের এই ২০% ছিল কেবলমাত্র ‘অপ্রত্যাশিত বা অতিরিক্ত লব্ধ’ সম্পদের ওপর যা মানুষের মৌলিক আয় নয়। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের মৌলিক আয়ে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কম হওয়া উচিত, বরং অতিরিক্ত বা খনিজ সম্পদের মতো উৎস থেকে প্রাপ্ত আয়ে সমাজের অধিকার বেশি হতে পারে। আবার আধুনিক ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে কেবল ঋণের সুদমুক্ত রূপান্তরে মনোযোগী, কিন্তু দারিদ্র্য বিমোচন বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে বদরের সেই “বিপ্লবী” প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। ফলে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধের একটি বড় কৌশল ছিল কুরাইশদের বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করা। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি চলে শিপিং রুট (যেমন সুয়েজ খাল, মালাক্কা প্রণালী) এবং ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম দিয়ে। বদরের দর্শন অনুযায়ী, মুসলিম দেশগুলোর উচিত ছিল নিজস্ব শক্তিশালী পেমেন্ট গেটওয়ে বা শক্তিশালী বাণিজ্যিক জোট (যেমন ডি-৮, ওপেকের আরও উন্নত রূপ) তৈরি করা।
বদরের গভীরতা সম্পদ বণ্টনের সীমানা পেরিয়ে একটি জাতির ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’ বা মেধা-সম্পদ উন্নয়নের দিকটিতেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির শর্ত হিসেবে ১০ জন শিশুকে শিক্ষিত করার যে নীতি রাসূল (সা.) গ্রহণ করেছিলেন, তার ভিত্তিতে মদিনার প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি আসে শিক্ষার মাধ্যমে। ‘যুদ্ধবন্দী’ মডেলে শিক্ষার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি ছিল এক অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ এবং সেখানে কাফেরদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করতেও মুসলিমরা দ্বিধা করেনি।
এই দূরদর্শী পদক্ষেপটি মদিনার অর্থনীতিকে কেবল পেশিশক্তিনির্ভর না রেখে একটি জ্ঞানভিত্তিক শক্তিশালী কাঠামোয় রূপান্তর করেছিল। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও বদরের সেই ‘স্বনির্ভরতার দর্শন’ আজ অনুপস্থিত। আমরা তথাকথিত ‘রেণ্টিয়ার স্টেট’ মডেলে আবদ্ধ হয়ে পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। বদর আমাদের শিখিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ (ঝঃৎধঃবমরপ ঈড়হঃৎড়ষ) এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ছাড়া রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা অসম্ভব।
আধুনিক ইসলামী অর্থনীতি যদি কেবল সুদের হিসাব পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বদরের মতো উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাবিকাঠি অর্জনে সচেষ্ট হয়, তবেই সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রকৃত সার্থকতা আজকের দিনেও খুঁজে পাওয়া সম্ভব। বদর যুদ্ধের ১৭ই রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রার্থনা তখনই আকাশ ছোঁয়, যখন জমিনে নিজেদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির বীজ বোনা থাকে।
অ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post