আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে (আইসিটি) জামায়াত নেতা ও প্রখ্যাত আলেম মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের রায় কে কেন্দ্র করে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। প্রতিবাদী বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলন ঠেকাতে সহিংস হয়ে ওঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব আন্দোলনে এক সপ্তাহে ১৬০ জনকে হত্যা করে আওয়ামী প্রশাসন।
এই নৃসংশ হত্যাকান্ডের পর শাপলা গণহত্যাসহ বিভিন্ন সময়ে বিরোধী মত দমন করতে হত্যা, গুম ও গ্রেফতারের মতো ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কিছু ঘটনার প্রতিবাদ বিভিন্ন পক্ষ থেকে হলেও মওলানা সাইদীর রায়ের প্রতিবাদে আন্দোলনকারী ১৬০ টি হত্যাকান্ডের বিষয়ে আন্তর্জাতি মহল থেকে প্রতিবাদ করা হলেও দেশের তৎকালীন প্রগতিশীল মহলকে তেমন প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। এভাবে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকদের হত্যাযোগ্য করে তোলে আওয়ামীলীগ ও কথিত প্রগতিশীল মহল। যার ফলে একটি সময় অনেকটা গোপনে রাজনীতি পরিচালিত করতে বাধ্য হন দলটির নেতাকর্মীরা।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আওয়ামী আমলের সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আলোচনা হলেও জাময়াত-শিবিরের এই ১৬০ জন নেতাকর্মীর বিষয়ে যেন ঠিক আগের মতোই গভীর নিরবতা বিরাজ করে। ফলে মৌন সম্মতির মাধ্যমে যেন সেই গণহত্যাকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে কিনা তা ভেবে দেখা দরকার।
২৮ অক্টোবর ২০০৬ বিএনপি জোট সরকারের শেষ দিকে এ আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত সহিংসতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে দেয়। নানা ষড়যন্ত্রে গতিপথ হারায় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় স্বার্থ উদ্ধার ও জাতীয় নিরাপত্তায় তাদের প্রয়োজন ছিলো একটি অনুগত সরকার। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভারতের হস্তক্ষেপে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পরিকল্পিত ও সাজানো নির্বাচনে একচ্ছত্র জয় পায় দলটি। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যের ভিত ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ভিত ভেঙে দিতে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটে যায় দেশবিরোধী সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের আড়ালে ভারতীয় পরিকল্পনায় দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের ওপর চালানো হয় হত্যাযজ্ঞ।
পরবর্তী লক্ষ্যে পরিণত হয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতীয় নেতৃবৃন্দ। এসময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াত জোটের নেতাদের একে একে গ্রেফতার করে আওয়ামী সরকার।
২০১০ সালের ২৯ এ জুন ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয় আল্লামা সাঈদীকে। পরবর্তীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে (আইসিটি) তার বিচার শুরু হয়। এছাড়া সেসময় গ্রেফতার হন জামায়াত নেতা গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অন্য শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
মাওলানা সাইদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালির গুম এবং স্কাইপি কেলেঙ্কারি প্রকাশের মধ্য দিয়ে এসব বিচারের পক্ষপাতিত্ব জাতির সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল–১ সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেন বিচারপতি ফজলে রাব্বি। রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। র্যাব-পুলিশের যৌথ বাহিনীর আগ্রাসী তাণ্ডবে প্রথম দিনেই প্রাণ হারান ৭০-এর অধিক বিক্ষুব্ধ জনতা। জনবিক্ষোভ দমন করতে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে চালানো হয় দমন-পীড়ন। এতে যৌথ বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডবে ১৬০ জন নিরীহ মানুষ নিহত হন। এমন আগ্রাসী উপায়ে বিক্ষোভ দমনের পেছনে ছিল পূর্বনির্ধারিত রায় বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমিয়ে দেওয়া।
জাতিসংঘ, এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানায়। সরকারের এমন ন্যাক্কারজনক আচরণ বিশ্বব্যাপী সমালোচিত হয়। সমসাময়িক ইতিহাসে কোনো একক ব্যক্তির জন্য এভাবে জনতার ভয়ডরহীন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ নজিরবিহীন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতন ও আধিপত্যবাদের ভিত নড়ে গেলেও এই গণহত্যার বিচার এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফ্যাসিবাদী আমলের গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইউনুস উক্ত গণহত্যাকে মানবাধিকার রিপোর্টে নথিভুক্ত করার অনুরোধ জানান। এতদসত্ত্বেও এই গণহত্যার বিচারে এখনো রাষ্ট্রীয় কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
হাসিনার দীর্ঘ শাসনের প্রারম্ভে এই বিক্ষোভ ছিলো প্রথম জনপ্রতিরোধ। বিচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফ্যাসিবাদ কায়েমের পথে এই বিক্ষোভ পরবর্তী আন্দোলনের ভিত হিসেবে কাজ করে।
ফ্যাসিবাদী আমলে সংঘটিত পিলখানা ম্যাসাকার, শাপলা গণহত্যা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে দমন-পীড়ন, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, মোদীবিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ এবং আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্রের বিচারের জনপ্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। তবে এসব ঘটনার বিচারের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি উঠলেও মাওলানা সাইদীর রায় পরবর্তী এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে নির্বিকার আচরণ যেন আবারো সেই হত্যাকান্ডকে বৈধতা দানের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয়।
বিচারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের নীরবতা এবং বিচার আদায়ে নাগরিক সমাজের নিষ্ক্রিয় মনোভাব নতুন করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। এসব গণহত্যার ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করে আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা আজ অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post