জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে দেশের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী। অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ থেকে মাঠের রাজনীতিতে সরব হয়ে স্বল্প সময়েই অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে দলটি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আওয়ামী নির্যাতনে কোনঠাসা অবস্থায় থাকা জামায়াতে ইসলামী মূলধারার রাজনীতিতে পূর্ণ মনোযোগ দেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বের করে আনে তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য। কীভাবে ঘটলো এমন ঐতিহাসিক উত্থান, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতার বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের বদৌলতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াতে ইসলামী। ১৯৭৯ সালে আদায় করে নেয় রাজনৈতিক নিবন্ধনও। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক লীগের মাধ্যমে নির্বাচন করে ৬টি আসনে জয় লাভ করে জামায়াতে ইসলামী।
পরবর্তীতে এরশাদ শাসনামলে ১৯৮৬ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসন লাভ করে জামায়াতে ইসলামী। মোট ভোটের শতকরা ৪.৬১ ভাগ ভোট পায় দলটি। নীলফামারী, চাপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরায় দলটি নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেই জামায়াতের সফলতা সীমাবদ্ধ ছিল এই নির্বাচনে।
স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দিয়ে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয় দলটি। ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মোট ভোটের ১২.১৩ শতাংশ নিয়ে ১৮টি সংসদীয় আসনে জয় লাভ করে। এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পরে চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাট, পাবনা, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা ও কক্সবাজারে নিজেদের ভোটের মাঠ প্রশস্ত করে।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এককভাবে অংশ নেয় দলটি। প্রায় সব আসনে নির্বাচন করে ৮.৬১ শতাংশ ভোটের পাশাপাশি তিনটি আসনে জয়লাভ করে। এবারের নির্বাচনে দলটি বরিশাল অঞ্চলের পিরোজপুরে একটি সংসদীয় আসনে জয় লাভ করে।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে জামায়াতে ইসলামী। ৩০টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করে মোট ভোটের ৪.২৮ শতাংশ পেয়ে ১৭টি আসনে জয়লাভ করে দলটি। দলটির আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল জোট সরকারের মন্ত্রীত্ব লাভ করে প্রথমবারের মতো সরকারের ক্ষমতার অংশীদার হন। আসনপ্রাপ্তি ও ভোটের মাঠ পূর্বের ন্যায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের কয়েকটি আসনে সীমাবদ্ধ থাকে।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জামায়াত বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণ করে। ৩৬টি আসনে নির্বাচন করে ৪.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ২টি আসন লাভ করে। এ নির্বাচনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দুটি আসন ছাড়া কোথাও জয়ী হতে পারেনি দলটি।
হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে জামায়াতে ইসলামীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু হয়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়। কেন্দ্র থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত সব কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচনে লড়ার সুযোগও নাকচ হয়ে যায়। কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে দলটির কার্যক্রম।
এরই মাঝে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ সরকার। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের দলীয় নির্বাচনে পরিণত হয়। সরকারের বিভিন্ন অংশ ও সুশীল সমাজ আওয়ামী লীগের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয় ছাত্রসমাজ। ব্যাপক আন্দোলনের পর নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী সরকার কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবি মেনে নেয়। ২০২৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরা হাইকোর্টে রিট করে কোটা পদ্ধতিকে পূর্বের অবস্থায় ফেরত চায়। ফলে আবারও কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এই আন্দোলনে বড় ভুমিকা রাখে ছাত্রশিবির। ফলে আন্দোলনের মধ্যেই জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ। এছাড়া আন্দোলন দমনে হাসিনাকে গণহত্যার আশ্রয় নিতে হয়। কিন্তু বিধিবাম, এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে পতন হয় হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের।
হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে ১৭ বছরের ক্ষত সামলে পুরোদমে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয় জামায়াতে ইসলামী। শহীদ পরিবার ও আহতদের সহযোগিতার মাধ্যমে সারা দেশে চষে বেড়ান দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি এ সময়ে নিজের ইমেজ অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
নানারকম সমাজকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে দলটি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় সাফল্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। বিএনপি দলীয় শৃঙ্খলার অভাব ও সংঘাতে যখন ইমেজ সংকটে পড়ে, ঠিক তখন ভোটের মাঠে নিজেদের যোগ্য ও সৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে জামায়াত।
সর্বশেষ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করে। ২২৭টি আসনে নির্বাচন করে মোট ভোটের ৩১.৭৬ শতাংশ পেয়ে ৬৮টি আসন লাভ করে জামায়াত। ভোটের হিসাবে পায় ২,৪২,৭৪,২১২ ভোট। জোটগতভাবে অর্জন করে ৭৭টি আসন। দেশের উত্তরের রংপুর ও রাজশাহী, পশ্চিমের খুলনার পাশাপাশি এবার ময়মনসিংহ, ঢাকা ও বরিশালেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে দলটি। ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় লাভ করে এবং একটি আসনে জোটসঙ্গী এনসিপি জয়ী হয়—যা দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসনপ্রাপ্তি। এছাড়া ৩০ টি আসনে নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে দলটি। কারচুপি না হলে আরো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো বলে মনে করে দলটির নেতাকর্মীরা।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক বলয় ভেঙে জামায়াত ও বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগের সূচনা হলো। ১৯৯৬ সালের পর গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সংসদীয় বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে জামায়াতে ইসলামী। ডান ও বামপন্থার মতাদর্শিক রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে ডান ও মধ্যমপন্থার রাজনৈতিক সমীকরণে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। দেশ-বিদেশে ভোটের মাঠে জামায়াতের এই উত্থান নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ। আগামী দিনের সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন ধারার সূচনা হবে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
Discussion about this post