ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর মঙ্গলবার বিকেলে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার। নতুন সরকারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গণভোট এবং জুলাই গণহত্যার বিচার—এসব ইস্যু বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসবে।
নতুন সরকারের শপথের প্রথম সপ্তাহেই পবিত্র রমজান মাস শুরু হচ্ছে। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ইতিমধ্যে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই-পরবর্তী ভঙ্গুর মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের মনোবল সংকট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নেতিবাচক অবস্থায় ফেলেছিল। হাসিনা সরকারের অব্যবস্থাপনা এবং পুলিশকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করায় জনমনে পুলিশের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নমনীয় নীতির ফলে পুরো সময়জুড়ে পুলিশের ভূমিকা ছিল অপ্রত্যাশিত। পুলিশের শৃঙ্খলা ও মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
জুলাই-পরবর্তী নানা সংঘাত ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে দুই শতাধিক খুন, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও ধর্ষণসহ অসংখ্য অপরাধের অভিযোগে জর্জরিত বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। টিআইবির প্রতিবেদনে গত দেড় বছরে ৬০০ সহিংসতার ঘটনার মধ্যে ৯১.৭ শতাংশ ঘটনায় দলটির নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শোকজ, বহিষ্কার ও নানামুখী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। সরকারে আসার পর দলীয় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে তারেক রহমানের জন্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকালে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় ছিল না। নতুন সরকারের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
সরকারের পথচলার প্রথম দিনেই গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার ও গণপরিষদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ করেননি বিএনপির সংসদ সদস্যরা। অপরদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট গণভোটের আলোকে দুটি শপথই গ্রহণ করেছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উদ্ভূত এই সংকট নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জিং ইস্যু হিসেবে দেখা দিয়েছে। এর ফলে জুলাই গণঅভ্যূত্থানে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আস্থা হারিয়েছে দলটি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে এই অসন্তোষ বাড়তে থাকবে। এদিকে বিএনপির নেতাদের একটি অংশ জুলাই সনদ নিয়ে হতাশাজনক কথাবার্তা বলছেন। ফলে এই বিষয়টি সমন্বয় করা কঠিন হবে তারেক রহমানের জন্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদী কর্তৃপক্ষের বিচার অনেকাংশে এগোলেও এই প্রক্রিয়া এখনো অসম্পূর্ণ। বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য অবধারিতভাবেই থাকবে। একই সঙ্গে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পরিণতি কী হবে, সে সিদ্ধান্তও এই সময়েই নিতে হবে।
সময়ের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। সরকারের সক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে।
Discussion about this post