১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে সংঘটিত এই বিপ্লবের পর গণভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন এই রাষ্ট্রব্যবস্থা নানা সংকট ও চাপের মধ্যেও গত ৪৭ বছর ধরে টিকে আছে। এই সময়ে বিশ্বের নানা শাসনব্যবস্থার উত্থান-পতন হলেও ইরানের ইনে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকা নিয়ে কৌতুহল রয়েছে বিশ্লেষকদের মাঝে।
ইরানে শাহ আমলের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সামাজিক বৈষম্যই বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করে। বিপ্লব পরবর্তী গত ৪৭ বছরে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এর অনন্য রাজনৈতিক কাঠামো। ধর্মীয় নেতার অভিভাবকত্ব এবং আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ দেশটিকে রাজনৈতিক ঝড়ের মাঝেও স্থিতিশীলতা দিয়েছে। যখনই কোনো সংকট দেখা দিয়েছে, সুপ্রিম লিডারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং ইসলামি বিপ্লবি গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় সেটিকে প্রশমিত করেছে। বিশেষ করে আইআরজিসি কেবল সামরিক বাহিনী হিসেবে নয়, বরং দেশের অর্থনীতির বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের ভিতকে শক্তিশালী করে রেখেছে।
বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ‘বেলায়েত-এ-ফকিহ’ তত্ত্ব। এই ধারণা অনুযায়ী, রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে একজন ইসলামি আইনজ্ঞের হাতে। এর ফলে ইরানে গড়ে ওঠে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও নির্বাচিত সরকারের সমন্বয়ে একটি ‘থিওক্র্যাটিক রিপাবলিক’ কাঠামো।
বর্তমান কাঠামোতে সুপ্রিম লিডার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তিনি সশস্ত্র বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সংসদ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই দ্বৈত-কর্তৃত্ব কাঠামো ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একদিকে নিয়ন্ত্রিত, অন্যদিকে অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়ার বিধান রয়েছে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা বিজয়ী প্রার্থীর জন্য বিস্তৃত জনসমর্থন নিশ্চিত করে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইরানের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করেছে। গার্ডিয়ান কাউন্সিলের যাচাই প্রক্রিয়ার কারণে প্রার্থিতা সীমিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও টিকে থাকার কৌশল তৈরি করেছে ইরান। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর থেকে এবং পরমাণু কর্মসূচিকে ঘিরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে দেশটি। এর প্রেক্ষিতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ ধারণা সামনে আনেন। এতে তেলনির্ভরতা কমানো, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং বিকল্প বাণিজ্য জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এই নীতির ফলে ইরান শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদন, ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প এবং ড্রোন প্রযুক্তিতে সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চুক্তি এবং রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলার চেষ্টা করছে তেহরান। চীন বর্তমানে ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ইরান তার প্রতিরক্ষা সীমানাকে নিজ দেশের বাইরে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। প্রক্সি যুদ্ধের এই কৌশল ইরানকে সরাসরি বড় কোনো যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাবকে অপরিহার্য করে তুলেছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি, তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বেড়েছে, তবুও নিরাপত্তা বাহিনীর সংহতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দৃঢ়তার কারণে তারা প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে আছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়েও ইরান তার অভ্যন্তরীণ কঠোরতা এবং আন্তর্জাতিক দর কষাকষির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের বড় একটি অংশ এখনও বিপ্লবী আদর্শে বিশ্বাসী থাকলেও তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ বেশি উদার ও বৈশ্বিক মূল্যবোধে আকৃষ্ট। ২০২২ সালের মাহসা আমিনি আন্দোলন এই সামাজিক দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসে। নারীর অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে আন্দোলন দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের টিকে থাকার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে। প্রথমত, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রেখেছে। দ্বিতীয়ত, মতাদর্শিক ভিত্তি, যা জনগণের একটি অংশের কাছে রাষ্ট্রের বৈধতা নিশ্চিত করে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কৌশলগত জোট, যা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করছে।
ইবনে মোহাম্মদ আলী
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Discussion about this post