আমেরিকা যেকোনো দিন ইরানের ওপর আক্রমণ করতে পারে, আর সেই মুহূর্তেই আমরা যে পৃথিবীটাকে চিনতাম, তা চিরতরে বদলে যাবে। আমাদের চিরচেনা যেসব জিনিস আমরা সবাই জানি, যেগুলো নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্ক করি, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি– সবকিছুই আগামী কয়েক বছরে আমূল পাল্টে যাবে। আমরা এক ভয়াবহ পরিবর্তনের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি।
ইতিহাসের অপমৃত্যু ও অধিকারের লড়াই
১৯৫০-এর দশকে আমাদের স্বপ্ন ছিল ভূমি-সংস্কার। আমরা বিশ্বাস করতাম, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বিপুল জমি আর বাকিরা ভূমিহীন– এই বৈষম্য চলতে পারে না। জমি সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। এরপর ৬০-এর দশকে এলো নকশাল আন্দোলন; তারা কৃষকের জন্য জমির অধিকার আর বিপ্লবের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু, তাদের নির্মমভাবে দমন করা হলো।
পরবর্তীতে আমরা দেখেছি নর্মদা বাঁচাও এবং উচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলন। মানুষ সেখানে বিলাসিতা চায়নি, শুধু তাদের যা আছে তা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল। সেটিও কেড়ে নেওয়া হলো। এরপর এলো ১০০ দিনের কাজের (NREGA) মতো প্রকল্প; জমি পাবেন না, কোনো অধিকার পাবেন না, কিছুই না; যেখানে মানুষের অধিকার সংকুচিত হতে-হতে কেবল বছরে ১০০ টাকার বিনিময়ে শ্রম দেওয়ার জায়গায় এসে ঠেকল।
আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে? আজ আমরা লড়ছি আমাদের ন্যূনতম নাগরিকত্বের জন্য, ভোটার তালিকায় নাম লেখানোর অধিকারের জন্য। সবটুকু ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আমাদের অস্তিত্বকেই আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে।
ফ্যাসিবাদের সামাজিকীকরণ
আপনি যদি উত্তর-ভারতে যান, দেখবেন, সেখানে ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ এখন কেবল রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সীমাবদ্ধ নেই– ফ্যাসিজম এখন জনগণের গভীরে, মানুষের মনে, ভাবনায়, আলাপচারিতায়, মদের বারগুলোতে, প্রতিদিনের কথাবার্তায়, এমনকি বলিউডের প্রতিটি সাংস্কৃতিক উপাদানেও তা মিশে আছে।
আমাদের বুঝতে হবে, আমরা এক ভয়াবহ পরিবর্তনের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি।
মাঝে-মাঝে ইচ্ছে হয়, কেরালা থেকে কিছু মানুষকে তুলে নিয়ে উত্তরপ্রদেশ, বিহার আর দিল্লিতে রেখে আসি; তারা দেখুক দেশের কী দশা হয়েছে। কংগ্রেস আর সিপিএম একে অপরকে গালাগালি করুক, লড়াই করুক– তাতে সমস্যা নেই, গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কেরালার ওপর আমার গর্ববোধের কারণ হলো, প্রতি পাঁচ বছর পর আমরা আগের সরকারকে বিদায় দিয়ে নতুন সরকার নিয়ে আসি।
কেরালার ওপর আমার গর্ববোধের কারণ হলো, প্রতি পাঁচ বছর পর আমরা আগের সরকারকে বিদায় দিয়ে নতুন সরকার নিয়ে আসি। কিন্তু আমরা ‘ওদের’ মতো (দিল্লির শাসকগোষ্ঠী) সরকার চাই না। আপনাকে আপনার যা আছে সেটা রক্ষা করতে হবে, তার জন্য লড়াই করতে হবে।
ব্যক্তিগত স্মৃতি ও ড্রেস কোড
দেখে সত্যিই খুব কষ্ট হয়। ত্রিভানন্দ্রমের কর্পোরেশন নির্বাচনে যা হলো, সেটা হওয়ার কথা ছিল না। আজ সকালে দত্ত সাহেব আর রাজা কৃষ্ণ সাহেব আমাকে পুরনো দিনের কথা বলছিলেন। আমি যখন আমার প্রথম সিনেমার স্ক্রিনপ্লে লিখেছিলাম– যেটার জন্য ‘অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ (Annie Gives It Those Ones) সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতেছিল– তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। সেটা ছিল একটা ছোট ফান ফিল্ম।
আমি যখন স্টেজে পুরস্কার নিতে গেলাম, তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন ভেঙ্কটরামন। তথ্য ও সম্প্রচার সচিব খুব রেগে গিয়েছিলেন, কারণ আমার পোশাক ‘যথাযথ’ ছিল না। তিনি বললেন, ‘আগামী বছর থেকে এখানে ড্রেস কোড থাকবে’। আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি আগামী বছর এখানে থাকব না।’ প্রেসের লোকেরা ভাবল রাষ্ট্রপতির সাথে আমার কোনো তর্ক হয়েছে। আমি বললাম, ‘শুনেননি? তিনি বলেছেন– চিল আউট, বেবি (ঠান্ডা থাকো, বেবি)!’
প্রথমবার লিখে পুরস্কার পাওয়া। আর, সেই সময় দত্ত-সাহেব আমার মায়ের স্কুলে পড়াতেন। অথচ, আমি সাত বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলাম, মায়ের সাথে দেখা হয়নি। বাড়ি মানেই একটা যন্ত্রণার জায়গা। আমি যখন বিশ্বভ্রমণের ব্যাগ গুছাই, তখন জানি আমি কেরালায় ফিরছি। এটা কোনো নিছক আবেগ নয়, এটা রাজনৈতিক, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক অহংকারের জায়গা। আমি জানি এই সংস্কৃতি আজ আক্রমণের মুখে। আমরা কতদিন টিকব জানি না, তবে আশা করি চিরকাল টিকে থাকব।
অবরুদ্ধ স্বর্গ ও বিশ্বনাগরিকতা
কেরালা এখনো ইনসুলেটেড বা বিচ্ছিন্ন বলেই হয়তো টিকে আছে। উত্তর ভারতে যা ঘটছে, তা দেখলে বুক ফেটে যায়। হিন্দুরা মুসলিমদের সাথে যেভাবে কথা বলছে, গির্জা পোড়ানো হচ্ছে– গত বছর গার্ডিয়ানের রিপোর্ট অনুযায়ী ৩০০-এর বেশি গির্জা পোড়ানো হয়েছে। মণিপুরে যা হলো তা আমরা দেখেছি। আগুন লাগানো খুব সহজ। কেরালায় যদি সেই আগুন লাগে, তবে এটি লেবানন হয়ে যাবে। আমাদের এই আগুন লাগানো থামাতে হবে।
যখন মালায়াতুর ফাউন্ডেশন আমাকে পুরস্কার দিতে চাইল, আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা নিশ্চিত? কারণ, আমি জিনগতভাবে অর্ধেক মালায়ালি আর লিখি ইংরেজিতে।’ তারা বলল, ‘আমরা নিশ্চিত।’ এটাই কেরালার কসমোপলিটানিজম বা বিশ্বজনীনতা।
কয়েক দিন আগে আমি কলকাতায় ছিলাম। সেখানে সবাই আমার সঙ্গে অনর্গল বাংলায় কথা বলছিল। আমি বারবার বলছিলাম, ‘না, আমি মালয়ালি।’ যদিও তারা সবাই কলকাতায় আমার বাবার পরিবারের ইতিহাস জানে, তবুও আমি মনে-প্রাণে একজন মালয়ালি। আমাদের এই যে একসাথে মিলেমিশে থাকার সংস্কৃতি, একে আমি গভীরভাবে ভালোবাসি। কিন্তু আমি উত্তর-ভারতে থাকি বলে প্রতিনিয়ত এক গভীর আশঙ্কার মধ্যে থাকি যে, সামনে কী ঘটতে চলেছে।
আমার প্রতিটি সৃজনশীল কাজ, সেটি ‘গড অফ স্মল থিংস’ হোক, রাজনৈতিক প্রবন্ধ হোক, চিত্রনাট্য হোক কিংবা স্মৃতিকথা– সবই আমার কাছে চূড়ান্তভাবে রাজনৈতিক। আমি শুধু ‘গড অফ স্মল থিংস’ নয়, বরং বৃহত্তর সাধারণ মঙ্গল এবং কল্পনার মৃত্যু নিয়ে লিখেছি।
এমনকি আমার মা ‘মেরি’-কে নিয়ে যখন লোকে কথা বলে, তারা তাদের চেনা ছাঁচে আমার মাকে খুঁজতে চায়। আমার মা বা বাবার চিরাচরিত রূপ নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলে। আমি তাদের বলি– না, এটি সেই ধরণের মা-মেয়ের গল্প নয়।
এটি এমন দুই নারীর আখ্যান যারা জগতের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বেঁচে ছিল। এমন দুই নারীর গল্প যারা একইসাথে প্রকাশ্য রাজপথে রাজনৈতিক লড়াই লড়েছে এবং অন্তরালে নিজেদের ব্যক্তিগত যুদ্ধগুলো সামলেছে। শেষ পর্যন্ত এটি এক ‘কঠিন ভালোবাসার’ (Most difficult kind of love) গল্প। আর সেই ভালোবাসার পরিধি এতটাই বিস্তৃত যে, এর মধ্যে জড়িয়ে আছে এই মাটির প্রতি আমার টান।
ইউপি-নির্বাচনের সময় যোগী আদিত্যনাথ বলেছিলেন– ‘বিজেপিকে ভোট না দিলে উত্তরপ্রদেশ কেরালা হয়ে যাবে’। আমি বলেছিলাম, ‘এটাই তো আমাদের আশা! আমার মা কেরালায় স্কুল চালান। তিনি যখন অসুস্থ হন, তাকে যে হাসপাতালে নেওয়া হয় সেটার ডাক্তার হয়তো তাঁর কোনো ছাত্র। এটা কি কোনো খারাপ বিষয়?’ তারা আমার এই বিদ্রূপটা বোঝেনি।
এআই এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনাশ
১৯৫০-এর সেই ভূমি সংস্কারের স্বপ্ন আজ চুরমার। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই সবকিছু বদলে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা, আন্তর্জাতিক আইন, এমনকি ‘তথ্য’ বলে যে যৌথ ভিত্তির ওপর আমরা তর্ক করি– সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে।
আমি নিজেই এমন ছবি দেখি যা আমার নয়, এমন লেখা দেখি যা আমি লিখিনি– সবই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) তৈরি।
আমাদের বুদ্ধিমত্তা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, বিজ্ঞান– সবকিছুই কর্পোরেট মালিকানার অধীনে চলে যাচ্ছে। আমরাই সম্ভবত সেই শেষ প্রজন্ম, যারা সমালোচনামূলক চিন্তার (Critical Thinking) শিক্ষা পেয়েছি। এআই নতুন প্রজন্মের সেই ক্ষমতাকে ক্ষয় করছে। আমেরিকায় শিক্ষকেরা পদত্যাগ করছেন কারণ ছাত্ররা আর গভীরভাবে পড়তে পারে না। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। যখন কোনো স্থিতিশীল যৌথ সত্য নেই, তখন মতভেদ প্রকাশ করাও বিলাসিতা।
আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আইন ও শৃঙ্খলার ধারণা ভেঙে পড়বে। এমনকি ‘তথ্য’ বা ‘সত্য’ বলে যে যৌথ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা বিতর্ক করি, সেই ভিত্তিটাই আজ আলগা হয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর যুগে আমি এমন ছবি বা ভিডিও দেখি যা আমার নয়, এমন লেখা দেখি যা আমি লিখিনি– অথচ সেখানে আমারই অস্তিত্ব ফুটে উঠছে।
উপসংহার: যুদ্ধের ছায়া ও সজাগ থাকা
ইরান আজ পারমাণবিক রণতরী আর যুদ্ধবিমান দিয়ে ঘেরা। যদি যুদ্ধ বাঁধে, পৃথিবী অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে যাবে। অন্তত আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ত্রিভানন্দ্রমের কর্পোরেশন নির্বাচনে যা ঘটেছে, সেখান থেকেই লড়াই শুরু করতে হবে। আমাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বুদ্ধিবৃত্তি– এগুলো হারাতে দেবেন না।
এটি হয়তো প্রচলিত সাহিত্যিক ধাঁচের বক্তৃতা নয়, কিন্তু এটি একটি ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক থেকে আসা শব্দমালা। আমার প্রতিটি লেখা– উপন্যাস হোক বা স্মৃতিকথা ‘মাদার মেরি’– সবই পলিটিক্যাল। যেকোনো দিন পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে, আমাদের জানতে হবে আমাদের দিকে কী ধেয়ে আসছে।
ধন্যবাদ।
লেখক: অরুন্ধতী রায়
ভাষান্তর: ফাইজান বিন হক
Discussion about this post