দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় বসেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। পরিবর্তনের হাওয়া বইছে রাজনীতির আকাশেও। আর সেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে আইনগতভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পরদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় একে একে খুলতে শুরু করেছে দলীয় কার্যালয়। সামনে আসতে শুরু করেছেন প্রায় আত্মগোপনে থাকা দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরাও।
নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি সর্বপ্রথম উত্তরের জেলা পঞ্চগড় সদরের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার খবর আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, তালা খুলে দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবু দাউদ প্রধান। এভাবে দেশের পৃরায় ১৫ জেলায় একের পর এক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অফিস খোলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।
আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। প্রশ্ন অনেকের- বিএনপি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই আইনকে অমান্য করে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা তাদের অফিসগুলো খুলে কীভাবে? বিএনপি কি তাদেরকে এমন কোনো গ্রিন সিগনাল দিয়েছে যার কারণে এই সাহস পেয়েছে? কারো কারো মতে, খাল কেটে কুমির আনছে বিএনপি। কারো বক্তব্য, তারা আগেই জানতেন এমন কিছু ঘটবে। কেউ কেউ আবার আক্ষেপ করে বলছেন—এই তো খেলার শুরু, সামনে রয়েছে আরও অনেক কিছু।
বিষয়টি নিয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এটা আমরা চাই না এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস খোলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছেন এনসিপি-র নেতারা। নিজেদের ফেসবুক পেজে বিষয়টি নিয়ে একের পর এক পোস্ট করছেন তারা। সোমবার এমনই এক ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহকে খোঁজ করেন এনসিপি-র মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী। পোস্টে হাসনাত লিখেন, “সবকিছুই সমঝোতার।” তিন শব্দে সারজিস আলম লিখেন, “সেই পুরোনো রাজনীতি।” এদিকে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন নিয়ে এনসিপি-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির সবুজ সংকেতের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, “দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার পেছনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সবুজ সংকেত রয়েছে। বিএনপির কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া আওয়ামী লীগ এটা করার সুযোগ বা সাহস পেত না। গত দেড় বছর কিন্তু প্রশাসন অনেক জায়গায় ব্যর্থ হলেও জনগণ কিন্তু প্রতিরোধ করেছে।”
অফিস খুলে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় বিএনপি সরকারের ‘ছাড় দেওয়ার মানসিকতায়’ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তার মতে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ আরও কতিপয় নেতার বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মামলা থেকে মুক্তি, নিরাপত্তা ও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রকাশ্য বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ দলটি আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক তারা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। এক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু আপস-সমঝোতা হয়েছে। সেটার ফলাফল হিসেবেই এখন কার্যালয় খোলার ঘটনাগুলো ঘটছে। বর্তমানে আইনের দায়িত্ব হচ্ছে বিএনপি প্রশাসনের। আইনগতভাবে বাংলাদেশে যাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ অফিস খোলায় তাদের বিরুদ্ধে বিএনপি প্রশাসনের দায়ভার বর্তায়। বিএনপি তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো শক্ত অবস্থান নিচ্ছে না। যদি শক্ত অবস্থান না নেয় তাহলে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করে রাখার কি দরকার? আর তাদের যে নিষেধাজ্ঞা আছে সে নিষেধাজ্ঞাও তুলে দেওয়া হোক।
এই জায়গাটাতে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বিএনপির কোনো স্পষ্ট অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। বিএনপির টকশোজীবীরা আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান তৈরি করে যাচ্ছে। বিএনপির কিছু প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে লীগকে দেশের ক্ষমতায় ফেরানো হচ্ছে। এর জন্য পথের কাঁটা হচ্ছে জুলাইযোদ্ধারা।
জুলাই গণঅভ্যূত্থানে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধের মুখে ঘাতক পুলিশ হত্যার বিচারের পক্ষে মির্জা ফখরুলসহ সালাউদ্দিন আহমেদের অবস্থান দেখা যাচ্ছে। এতে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন না বরং লীগকে দেশের ক্ষমতায় ফেরানোর পরিকল্পনা করছে বিএনপি।
এক সপ্তাহের ভেতর নারায়নগঞ্জের আইভী থেকে কক্সবাজারের ইয়াবা বদিসহ চারজন আওয়ামী এমপির মুক্তি, দশের ওপর “জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারি” গোছের সন্ত্রাসীদের মুক্তি। এসব ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মী মিষ্টি বিতরণ করছে।
বাংলাদেশ গভর্নর মনসুরকে সরানোর পেছনে এস আলমের কলকাঠি নাড়া। একরাতেই তাজুল ইসলামকে চীফ প্রসিকিউটর পদ থেকে সরিয়ে দেয়াসহ মেয়র নির্বাচন না করে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ সন্দেহ সৃষ্টি করছে।
যা বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত নিয়ে আসবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিএনপির রাজনৈতিক সংগ্রাম ও সাফল্যের ইতিহাস বেশ পুরোনো। দেশের রাজনীতিতে নানা সংগ্রাম ও ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে যে দলটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে, আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে আজ সেই দলটি জনগণের আস্থা হারাতে বসেছে।
ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের হাতে বিএনপির ১০ জন কর্মী এখন পর্যন্ত খুন হয়েছে। এর শেষ কোথায়? সেই সিদ্ধান্ত বিএনপিকে নিতে হবে। সরকারের সবুজ সংকেত কিংবা নির্বাচন-পূর্ব স্থানীয় সমঝোতা যাই হোক, দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস খোলার বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের বেশিরভাগই দেখছেন অজানা আতঙ্ক হিসেবে। সাধারণ মানুষের শঙ্কা—এতে করে হয়তো সহসাই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে রাজনীতির মাঠ, আবারও ফিরে আসতে পারে হানাহানি আর সহিংস রাজনীতির পুরোনো সংস্কৃতি। আর এর দায় নিতে হবে বিএনপিকেই কারণ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ফেরাতে সবচেয়ে বড় ভুমিকা রেখেছে তারা।
এ্যানালাইসিস টিম
Discussion about this post